
চারটি বছর কেটে গেছে, কিন্তু ঢাকার ধামরাই উপজেলার পশ্চিম দেপাশাই এলাকায় বংশী নদীর ওপর নির্মাণাধীন ব্রিজের কাজ শেষ হয়নি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চরম গাফিলতি এবং উদাসীনতায় দুই পারের কয়েক হাজার মানুষের নিত্যদিনের যাতায়াত এখন নরকযন্ত্রণা। কোমলমতি স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের একমাত্র ভরসা এখন ঠিকাদারের তৈরি করা একটি নড়বড়ে ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো। এই সাঁকো পার হতে গিয়ে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা, তবুও যেন ঘুম ভাঙছে না সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের।
সোমবার (২৯ জুন) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ব্রিজের কাজ চললেও তার গতি অত্যন্ত ধীর। টেন্ডারের শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণই নেই।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, দুই পারের মানুষের যোগাযোগের সুবিধার্থে ২০০৪ সালের দিকে বংশী নদীর ওপর একটি সরু ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং যাতায়াত ব্যবস্থা আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ২০২২ সালের ৩১ মে পুরনো ব্রিজটি ভেঙে নতুন একটি বৃহৎ ব্রিজ নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করা হয়। তৎকালীন সংসদ সদস্য ধুমধাম করে কাজের উদ্বোধন করলেও, সেই আনন্দ এখন স্থানীয়দের জন্য বিষাদে পরিণত হয়েছে।
উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED) সূত্রে জানা যায়, প্রথম দফায় ব্রিজের কাজ পায় ‘মেসার্স কামার জান আনোয়ারা জেবি’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০২৩ সালের ২৩ জুনের মধ্যে তাদের কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি পুরনো ব্রিজটি ভেঙে ভেতরের মূল্যবান মালামাল ও রড নিয়ে রাতারাতি এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। এরপর থেকেই শুরু হয় দুই পারের মানুষের চরম দুর্ভোগ।
পরবর্তীতে দীর্ঘ জটিলতা কাটিয়ে ২০২৪ সালের ৬ নভেম্বর ৬ কোটি ৬৪ লাখ ১৬ হাজার ৪৬৮ টাকা ব্যয়ে নতুন করে রি-টেন্ডার করা হয়। এবার কাজ পায় ‘মেসার্স উপকূল করপোরেশন’ নামের আরেকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।নতুন চুক্তির শর্তানুযায়ী, আগামী ১২ আগস্ট ২০২৬ সালের মধ্যে ব্রিজের নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ শেষ করে চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় দুই বছর পার হতে চললেও কাজের অগ্রগতি ৬০ শতাংশের নিচে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ধীরগতির কারণে দীর্ঘদিন ধরে খোলা আকাশে নিচে পড়ে থাকা ব্রিজের রডগুলোতে মারাত্মকভাবে মরিচা ধরে গেছে। এই মরিচা ধরা রড দিয়েই তড়িঘড়ি করে ঢালাইয়ের কাজ করা হচ্ছে, যা নিয়ে স্থানীয়দের মনে ব্রিজের স্থায়িত্ব ও মান নিয়ে গভীর সংশয় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।ব্রিজটি সময়মতো নির্মিত না হওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।
স্থানীয় একজন মাদ্রাসা শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ব্রিজের কাজ শেষ না হওয়ায় আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য তো লাটে উঠেছেই, সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছে কোমলমতি শিশুরা। এই বিপজ্জনক বাঁশের সাঁকো পার হতে গিয়ে প্রায়ই শিশুরা পা পিছলে পড়ে আঘাত পাচ্ছে। আমরা বারবার তাগিদ দিলেও কেউ শুনছে না।”
জীবন নেছা নামে স্থানীয় এক অভিভাবক বলেন, “ছেলেমেয়েদের একা স্কুলে পাঠাতে পারি না, ভয় লাগে। এই নড়বড়ে সাঁকো দিয়ে পার হওয়ার সময় অনেকের পা আটকে যায়। কিছুদিন আগেই তো একটা ছোট বাচ্চা সাঁকো থেকে ফসকে সরাসরি নদীতে পড়ে গিয়েছিল! আল্লাহ রক্ষা করেছে যে বাচ্চাটা বেঁচে গেছে। আমরা আর কত কষ্ট করব? কাজটা দ্রুত শেষ করা হোক।”
কাজের এই ধীরগতি, অবহেলা ও মরিচা ধরা রড ব্যবহারের বিষয়ে জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার আমজাদ হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
তবে এ বিষয়ে ধামরাই উপজেলা প্রকৌশলী মিশুক কুমার দত্ত বলেন,”আন্তর্জাতিক বাজারের কারণে নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি এবং কিছু সামাজিক সমস্যার কারণে কাজের গতি কিছুটা কমেছিল। তবে আমরা বসে নেই, কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য নিয়মিত মনিটরিং করছি।”
ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল মামুন বলেন,”আগের ঠিকাদার পালিয়ে যাওয়ার কারণে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে কাজ চালু রাখা হয়েছে। কাজটি যাতে কোনোভাবেই আর ঝুলে না থাকে এবং দ্রুততম সময়ে শেষ হয়, সে বিষয়ে আমরা ইতোমধ্যেই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।”
স্থানীয় ভুক্তভোগী জনগণের দাবি, সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই ব্রিজের কাজ যেন আর একদিনও পিছিয়ে না পড়ে। একই সাথে, মূল ব্রিজ চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত বর্তমানের এই ‘মৃত্যুকূপ’ সদৃশ বাঁশের সাঁকোটি ভেঙে সেখানে একটি মজবুত ও নিরাপদ অস্থায়ী কাঠের বা লোহার বিকল্প সেতু তৈরি করে দেওয়ার জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন ধামরাইয়ের দুই পারের অবহেলিত হাজারো মানুষ।
আশরাফুল আলম 












