ঢাকা ০৮:৩২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬, ২৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাভারের হেমায়েতপুরে সড়ক ও ফুটপাত দখলে হকার, নির্বিকার প্রশাসন

শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত সাভারের হেমায়েতপুর—যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ যাতায়াত করেন। কিন্তু ব্যস্ত এই এলাকায় এখন সবচেয়ে বড় ভোগান্তির নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে সড়ক ও ফুটপাত দখল। হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে শুরু করে বাজারসংলগ্ন প্রায় প্রতিটি সড়ক ও ফুটপাতই এখন হকারদের নিয়ন্ত্রণে, ফলে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট ও জনদুর্ভোগ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যা চললেও প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই। বরং মাঝে মাঝে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও তা টেকসই হচ্ছে না। ফলে হকারদের দখল দিন দিন আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
হেমায়েতপুরের বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, “আমরা প্রতিদিন অফিসে যেতে গিয়ে দুর্ভোগে পড়ি। ফুটপাত দিয়ে হাঁটার কোনো সুযোগ নেই। বাধ্য হয়ে রাস্তায় নামতে হয়, এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।” একই কথা বলেন গৃহিণী রাশিদা বেগম। তিনি জানান, “বাচ্চাদের নিয়ে বাজারে বের হওয়া এখন আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। চারদিকে হকার, মানুষের ভিড়—হাঁটার মতো জায়গা নেই।”
স্থানীয় এক ব্যবসায়ী, মো. সোহেল রানা অভিযোগ করেন, “স্থায়ী দোকানদার হিসেবে আমরা ভাড়া, ট্যাক্স সব দিচ্ছি। অথচ হকাররা ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করছে, এতে আমাদের বিক্রি কমে যাচ্ছে। প্রশাসন এ ব্যাপারে চুপ কেন, সেটা আমাদের বোধগম্য নয়।”
সরেজমিনে দেখা যায়, হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন সড়ক এবং আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাতের অধিকাংশ অংশই দখল করে রেখেছে ভ্রাম্যমাণ দোকান।
পোশাক, ফলমূল, সবজি, ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী থেকে শুরু করে খাবারের স্টল—সবকিছুই বসানো হয়েছে ফুটপাতজুড়ে। কোথাও কোথাও রাস্তার অর্ধেক অংশও দখল করে রাখা হয়েছে, ফলে যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে।
সাভার পরিবহনের চালক হাফিজ উদ্দিন বলেন, “এই রাস্তায় বাস চালানো খুব কঠিন হয়ে গেছে। সামনে হকার, পাশে গাড়ি কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। দিনে কয়েকবার ঝগড়া লাগে।” তিনি আরও বলেন, “যাত্রীদের কাছ থেকেও আমরা বকা খাই, কিন্তু আসলে সমস্যার মূল তো অন্য জায়গায়।”
অন্যদিকে হকারদেরও রয়েছে নিজেদের যুক্তি। তারা বলছেন, জীবিকার তাগিদেই তারা ফুটপাতে বসতে বাধ্য হচ্ছেন। হকার আলমগীর হোসেন বলেন, “আমাদের তো আর বড় দোকান করার সামর্থ্য নেই। এখানে বসে যা আয় করি, তা দিয়ে পরিবার চালাই। যদি আমাদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে আমরা সেখানেই চলে যাব।”
আরেক হকার, রোকেয়া বেগম বলেন, “উচ্ছেদ অভিযান হলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হই। কিন্তু কিছুদিন পর আবার বসতে দেই। যদি স্থায়ী সমাধান হতো, তাহলে আমাদেরও সুবিধা হতো।”
স্থানীয় যুবক রুবেল আহমেদ মনে করেন, সমস্যার মূল কারণ হলো পরিকল্পনার অভাব। তিনি বলেন, “হকারদের পুরোপুরি উচ্ছেদ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। নইলে তারা আবার ফিরে আসবে।”
এ বিষয়ে সাভার উপজেলা সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে প্রশাসন কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে।খুব দ্রুত সাভার উপজেলার প্রত্যেকটা বাসস্ট্যান্ডেসহ সড়ক ও ফুটপাত হকার মুক্ত করা হবে।তিনি আরো বলেন, হকারদের পুনর্বাসনের বিষয়টি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ করা হলেও তারা আবার ফিরে আসে।”
তিনি আরও জানান, “স্থায়ী সমাধানের জন্য একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে, যাতে নির্দিষ্ট স্থানে হকারদের বসার ব্যবস্থা করা যায়।”
তবে স্থানীয়দের দাবি, শুধু পরিকল্পনা নয়, কার্যকর বাস্তবায়নই এখন সময়ের দাবি। তারা মনে করেন, প্রশাসন যদি কঠোর অবস্থান নেয় এবং নিয়মিত তদারকি করে, তাহলে এই সমস্যার অনেকটাই সমাধান সম্ভব।
পরিবহন শ্রমিকদের সংগঠনের এক নেতা বলেন, “হেমায়েতপুর সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে যদি শৃঙ্খলা না থাকে, তাহলে পুরো এলাকায় যানজট ছড়িয়ে পড়ে। আমরা প্রশাসনের কাছে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাই।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নগর পরিকল্পনার অভাব এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সংকট এই দুই কারণেই ফুটপাত দখলের সমস্যা বাড়ছে। তারা বলেন, হকারদের জন্য নির্দিষ্ট জোন তৈরি করা এবং কঠোর আইন প্রয়োগ—এই দুই পদক্ষেপ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে পারলেই কেবল দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব।
সব মিলিয়ে, সাভারের হেমায়েতপুরে সড়ক ও ফুটপাত দখল একটি জটিল সমস্যায় পরিণত হয়েছে। একদিকে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ, অন্যদিকে হকারদের জীবিকার প্রশ্ন এই দুইয়ের সমন্বয় করেই সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। তবে প্রশাসনের কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ ছাড়া এই সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।
ট্যাগ:

সাভারের হেমায়েতপুরে সড়ক ও ফুটপাত দখলে হকার, নির্বিকার প্রশাসন

আপডেট সময়: ০৮:৪৩:২৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১ মে ২০২৬
শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত সাভারের হেমায়েতপুর—যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ যাতায়াত করেন। কিন্তু ব্যস্ত এই এলাকায় এখন সবচেয়ে বড় ভোগান্তির নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে সড়ক ও ফুটপাত দখল। হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে শুরু করে বাজারসংলগ্ন প্রায় প্রতিটি সড়ক ও ফুটপাতই এখন হকারদের নিয়ন্ত্রণে, ফলে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট ও জনদুর্ভোগ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যা চললেও প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই। বরং মাঝে মাঝে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও তা টেকসই হচ্ছে না। ফলে হকারদের দখল দিন দিন আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
হেমায়েতপুরের বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, “আমরা প্রতিদিন অফিসে যেতে গিয়ে দুর্ভোগে পড়ি। ফুটপাত দিয়ে হাঁটার কোনো সুযোগ নেই। বাধ্য হয়ে রাস্তায় নামতে হয়, এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।” একই কথা বলেন গৃহিণী রাশিদা বেগম। তিনি জানান, “বাচ্চাদের নিয়ে বাজারে বের হওয়া এখন আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। চারদিকে হকার, মানুষের ভিড়—হাঁটার মতো জায়গা নেই।”
স্থানীয় এক ব্যবসায়ী, মো. সোহেল রানা অভিযোগ করেন, “স্থায়ী দোকানদার হিসেবে আমরা ভাড়া, ট্যাক্স সব দিচ্ছি। অথচ হকাররা ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করছে, এতে আমাদের বিক্রি কমে যাচ্ছে। প্রশাসন এ ব্যাপারে চুপ কেন, সেটা আমাদের বোধগম্য নয়।”
সরেজমিনে দেখা যায়, হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন সড়ক এবং আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাতের অধিকাংশ অংশই দখল করে রেখেছে ভ্রাম্যমাণ দোকান।
পোশাক, ফলমূল, সবজি, ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী থেকে শুরু করে খাবারের স্টল—সবকিছুই বসানো হয়েছে ফুটপাতজুড়ে। কোথাও কোথাও রাস্তার অর্ধেক অংশও দখল করে রাখা হয়েছে, ফলে যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে।
সাভার পরিবহনের চালক হাফিজ উদ্দিন বলেন, “এই রাস্তায় বাস চালানো খুব কঠিন হয়ে গেছে। সামনে হকার, পাশে গাড়ি কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। দিনে কয়েকবার ঝগড়া লাগে।” তিনি আরও বলেন, “যাত্রীদের কাছ থেকেও আমরা বকা খাই, কিন্তু আসলে সমস্যার মূল তো অন্য জায়গায়।”
অন্যদিকে হকারদেরও রয়েছে নিজেদের যুক্তি। তারা বলছেন, জীবিকার তাগিদেই তারা ফুটপাতে বসতে বাধ্য হচ্ছেন। হকার আলমগীর হোসেন বলেন, “আমাদের তো আর বড় দোকান করার সামর্থ্য নেই। এখানে বসে যা আয় করি, তা দিয়ে পরিবার চালাই। যদি আমাদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে আমরা সেখানেই চলে যাব।”
আরেক হকার, রোকেয়া বেগম বলেন, “উচ্ছেদ অভিযান হলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হই। কিন্তু কিছুদিন পর আবার বসতে দেই। যদি স্থায়ী সমাধান হতো, তাহলে আমাদেরও সুবিধা হতো।”
স্থানীয় যুবক রুবেল আহমেদ মনে করেন, সমস্যার মূল কারণ হলো পরিকল্পনার অভাব। তিনি বলেন, “হকারদের পুরোপুরি উচ্ছেদ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। নইলে তারা আবার ফিরে আসবে।”
এ বিষয়ে সাভার উপজেলা সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে প্রশাসন কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে।খুব দ্রুত সাভার উপজেলার প্রত্যেকটা বাসস্ট্যান্ডেসহ সড়ক ও ফুটপাত হকার মুক্ত করা হবে।তিনি আরো বলেন, হকারদের পুনর্বাসনের বিষয়টি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ করা হলেও তারা আবার ফিরে আসে।”
তিনি আরও জানান, “স্থায়ী সমাধানের জন্য একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে, যাতে নির্দিষ্ট স্থানে হকারদের বসার ব্যবস্থা করা যায়।”
তবে স্থানীয়দের দাবি, শুধু পরিকল্পনা নয়, কার্যকর বাস্তবায়নই এখন সময়ের দাবি। তারা মনে করেন, প্রশাসন যদি কঠোর অবস্থান নেয় এবং নিয়মিত তদারকি করে, তাহলে এই সমস্যার অনেকটাই সমাধান সম্ভব।
পরিবহন শ্রমিকদের সংগঠনের এক নেতা বলেন, “হেমায়েতপুর সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে যদি শৃঙ্খলা না থাকে, তাহলে পুরো এলাকায় যানজট ছড়িয়ে পড়ে। আমরা প্রশাসনের কাছে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাই।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নগর পরিকল্পনার অভাব এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সংকট এই দুই কারণেই ফুটপাত দখলের সমস্যা বাড়ছে। তারা বলেন, হকারদের জন্য নির্দিষ্ট জোন তৈরি করা এবং কঠোর আইন প্রয়োগ—এই দুই পদক্ষেপ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে পারলেই কেবল দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব।
সব মিলিয়ে, সাভারের হেমায়েতপুরে সড়ক ও ফুটপাত দখল একটি জটিল সমস্যায় পরিণত হয়েছে। একদিকে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ, অন্যদিকে হকারদের জীবিকার প্রশ্ন এই দুইয়ের সমন্বয় করেই সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। তবে প্রশাসনের কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ ছাড়া এই সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।