
উচ্চশিক্ষার সনদ হাতে থাকলে সাধারণত সবাই একটি নিরাপদ সরকারি বা বেসরকারি চাকরির পিছে ছোটে। কিন্তু প্রচলিত সেই চিরাচরিত পথ থেকে একদম উল্টো দিকে হেঁটে ব্যতিক্রমী উদাহরণ তৈরি করেছেন আবুল কাশেম। রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং আইন—দুটি বিষয়ে স্নাতকোত্তর (এমএ ও এলএলবি) ডিগ্রি অর্জন করেও তিনি কোনো বাঁধাধরা চাকরির তোয়াক্কা করেননি। নিজের মেধা ও শ্রমকে কাজে লাগিয়ে বেছে নিয়েছেন পশুপালন ও কৃষিকাজের মতো উৎপাদনমুখী পথ।
ঢাকার ধামরাই উপজেলার সীমান্তবর্তী ও মানিকগঞ্জ জেলার শেষ সীমানায় গড়ে তুলেছেন এক আশাজাগানিয়া প্রাণিসম্পদ খামার।
প্রায় তিন বছর দুই মাস আগের কথা। শুরুটা কিন্তু মোটেও বড় পরিসরে ছিল না। একটি প্রজননক্ষম পুরুষ ও তিনটি স্ত্রী—মাত্র এই চারটি গাড়ল নিয়ে ছোট আকারে যাত্রাশুরু করেছিলেন তিনি। সময়ের সাথে সাথে তাঁর একাগ্রতা ও যত্নে খামারের চিত্র বদলাতে শুরু করে। বর্তমানে তাঁর খামারে ছোট-বড় মিলিয়ে ২১টি গাড়ল রয়েছে। তবে কেবল সংখ্যা বাড়ানোই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য নয়; আবুল কাশেমের আসল ভাবনা প্রজনন বিজ্ঞানের সঠিক ব্যবহারে। উপযুক্ত প্রজনন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে দুম্বার গুণসম্পন্ন প্রাণীর সংখ্যা বাড়ানোই এখন তাঁর মূল লক্ষ্য। প্রজননের সুবিধার্থে তিনি ইতোপূর্বে দুম্বার পাঠা ব্যবহার করেছেন এবং ইতিমধ্যে তাঁর খামারের কয়েকটি বাচ্চার মধ্যে দুম্বার শারীরিক বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
উচ্চশিক্ষিত একজন মানুষ পশুপালনে নামছেন দেখে শুরুতে পরিবার ও আশপাশের সমাজ থেকে সহজভাবে মেনে নেওয়া হয়নি। অনেকে তাঁকে এই সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসতে বলেছিলেন, কেউ কেউ পশুপালনের কাজকে খাটো করেও মন্তব্য করেছিলেন। তবে সব লোকমুখের সমালোচনা ও সামাজিক বাধাকে পেছনে ফেলে তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন। বর্তমানে খামার পরিচালনায় তাঁর সহযোদ্ধা হিসেবে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তাঁর একাদশ শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে। বাবা ও ছেলে মিলে প্রতিদিন পরম মমতায় দেখাশোনা করেন খামারটি। গাড়ল ও দুম্বা প্রজননের পাশাপাশি আবুল কাশেমের কৃষি উদ্যোগও বেশ বিস্তৃত; তাঁর রয়েছে পেঁপের চারা উৎপাদন কেন্দ্র, পেঁপে বাগান এবং কলাবাগান।
সামনে আবুল কাশেমের স্বপ্ন আরও অনেক বড়। আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে খামারে অন্তত শতাধিক দুম্বা লালন-পালনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন তিনি। তবে এই সম্ভাবনাময় লক্ষ্যকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন বিজ্ঞানসম্মত উন্নত প্রজনন ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় কারিগরি জ্ঞান এবং সরকারি প্রাণিসম্পদ বিভাগের সরাসরি পরামর্শ ও সহযোগিতা।
শিক্ষিত বেকার যুবকদের প্রতি তাঁর বার্তা খুবই পরিষ্কার—কেবল ডিগ্রির ওপর নির্ভর করে চাকরির পেছনে মূল্যবান সময় নষ্ট না করে পশুপালন ও কৃষির মতো সম্ভাবনাময় খাতে আত্মকর্মসংস্থান গড়ে তোলা উচিত। যথাযথ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও পরিকল্পিত দিকনির্দেশনা পেলে আবুল কাশেমের মতো উদ্যোক্তারা কেবল নিজের ভাগ্যই বদলাবেন না, বরং বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতেও আনবেন বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
আশরাফুল আলম 














