ঢাকা ১২:৪৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে অসহায় সাভার-আশুলিয়ার নিম্ন আয়ের মানুষ

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে চরম বিপাকে পড়েছেন সাভার ও আশুলিয়ার নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। চাল, ডাল, তেল, ডিম, মাছ, মাংস, সবজি থেকে শুরু করে শিশুখাদ্য ও দৈনন্দিন ব্যবহারের বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ায় আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে পারছেন না শ্রমজীবী ও স্বল্প আয়ের মানুষ। মাসের শুরুতেই বেতনের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে খাবার ও বাসাভাড়ার পেছনে। ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য জরুরি খরচ কমিয়ে কোনোরকমে সংসার চালাতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে।

 

সাভার বাসস্ট্যান্ড, উলাইল, গেন্ডা, হেমায়েতপুর, নবীনগর, আশুলিয়ার বাইপাইল, জামগড়া, শিমুলিয়া ও আশপাশের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক অসন্তোষ। বিশেষ করে দিনমজুর, রিকশাচালক, পরিবহনশ্রমিক, পোশাকশ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলছেন, আয় যে হারে বাড়ছে তার তুলনায় সংসারের খরচ বাড়ছে অনেক বেশি।

 

সাভারের রিকশাচালক নাসির বলেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রিকশা চালিয়ে যে টাকা আয় করি, তার বেশির ভাগই বাজার ও বাসাভাড়ায় চলে যায়। আগে যে টাকায় পরিবারের জন্য কয়েক দিনের বাজার করা যেত, এখন সেই টাকায় এক-দুই দিনের বেশি চলে না। সন্তানদের পড়াশোনা ও চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে ঋণ করতে হচ্ছে।

 

আশুলিয়ার পোশাকশ্রমিক জাহানারা জানান, বেতন পাওয়ার পর প্রথমেই বাসাভাড়া, খাবার ও যাতায়াতের খরচ দিতে হয়। এরপর হাতে খুব বেশি টাকা থাকে না। বাজারে গেলেই বোঝা যায় কোন পণ্যের দাম কতটা বেড়েছে। অনেক সময় পছন্দের খাবার না কিনে কম দামের পণ্য দিয়ে সংসার চালাতে হচ্ছে।

 

বাজারসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার পর পরিবহন ভাড়া বেড়ে গেছে যার ফলে পণ্য পরিবহন, উৎপাদন ব্যয়, সরবরাহব্যবস্থা ও বাজারের বিভিন্ন স্তরে খরচ বৃদ্ধির প্রভাব খুচরা বাজারেও পড়ছে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই পণ্যের দাম বাজারভেদে ভিন্ন হওয়ায় ক্রেতাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে বিভ্রান্তি।

 

সাধারণ মানুষের অভিযোগ, বাজার তদারকি কার্যক্রম আরও জোরদার না হলে মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমানো কঠিন হবে।

 

গৃহিণীদের অনেকেই বলছেন, আগে সপ্তাহে একাধিকবার মাছ-মাংস কেনা হলেও এখন তা কমিয়ে দিতে হয়েছে। অনেক পরিবারে ডিম, ডাল ও সবজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। কেউ কেউ আবার বাজারের খরচ কমাতে একসঙ্গে বেশি পণ্য না কিনে প্রতিদিনের প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প অল্প করে বাজার করছেন।

 

আশুলিয়ার জামগড়া এলাকার এক ভ্যানচালক বলেন, সংসারে পাঁচজন মানুষ। সবার খাবার, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, বাড়িভাড়া ও চিকিৎসার খরচ আছে। কিন্তু আয় বাড়ছে না। বাজারে গেলেই মনে হয় টাকা যেন আগের চেয়ে দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।

 

অর্থনীতিবিদদের মতে, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ে। কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য ও মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যয় হয়। ফলে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে অন্যান্য খাতে ব্যয় কমাতে বাধ্য হন তারা।

 

সাভার ও আশুলিয়ার নিম্ন আয়ের মানুষের দাবি, বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকটের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় রেখে বাজার স্থিতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে শ্রমজীবী মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি না হলে মূল্যবৃদ্ধির এই চাপ দীর্ঘমেয়াদে তাদের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

 

নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতিতে সাভার-আশুলিয়ার বিশাল শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর জীবন এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। বাজারে স্বস্তি ফেরাতে কার্যকর নজরদারি ও দ্রুত পদক্ষেপের প্রত্যাশায় দিন গুনছেন সাধারণ মানুষ।

ট্যাগ:

নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে অসহায় সাভার-আশুলিয়ার নিম্ন আয়ের মানুষ

আপডেট সময়: ০৭:০১:১৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে চরম বিপাকে পড়েছেন সাভার ও আশুলিয়ার নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। চাল, ডাল, তেল, ডিম, মাছ, মাংস, সবজি থেকে শুরু করে শিশুখাদ্য ও দৈনন্দিন ব্যবহারের বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ায় আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে পারছেন না শ্রমজীবী ও স্বল্প আয়ের মানুষ। মাসের শুরুতেই বেতনের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে খাবার ও বাসাভাড়ার পেছনে। ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য জরুরি খরচ কমিয়ে কোনোরকমে সংসার চালাতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে।

 

সাভার বাসস্ট্যান্ড, উলাইল, গেন্ডা, হেমায়েতপুর, নবীনগর, আশুলিয়ার বাইপাইল, জামগড়া, শিমুলিয়া ও আশপাশের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক অসন্তোষ। বিশেষ করে দিনমজুর, রিকশাচালক, পরিবহনশ্রমিক, পোশাকশ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলছেন, আয় যে হারে বাড়ছে তার তুলনায় সংসারের খরচ বাড়ছে অনেক বেশি।

 

সাভারের রিকশাচালক নাসির বলেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রিকশা চালিয়ে যে টাকা আয় করি, তার বেশির ভাগই বাজার ও বাসাভাড়ায় চলে যায়। আগে যে টাকায় পরিবারের জন্য কয়েক দিনের বাজার করা যেত, এখন সেই টাকায় এক-দুই দিনের বেশি চলে না। সন্তানদের পড়াশোনা ও চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে ঋণ করতে হচ্ছে।

 

আশুলিয়ার পোশাকশ্রমিক জাহানারা জানান, বেতন পাওয়ার পর প্রথমেই বাসাভাড়া, খাবার ও যাতায়াতের খরচ দিতে হয়। এরপর হাতে খুব বেশি টাকা থাকে না। বাজারে গেলেই বোঝা যায় কোন পণ্যের দাম কতটা বেড়েছে। অনেক সময় পছন্দের খাবার না কিনে কম দামের পণ্য দিয়ে সংসার চালাতে হচ্ছে।

 

বাজারসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার পর পরিবহন ভাড়া বেড়ে গেছে যার ফলে পণ্য পরিবহন, উৎপাদন ব্যয়, সরবরাহব্যবস্থা ও বাজারের বিভিন্ন স্তরে খরচ বৃদ্ধির প্রভাব খুচরা বাজারেও পড়ছে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই পণ্যের দাম বাজারভেদে ভিন্ন হওয়ায় ক্রেতাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে বিভ্রান্তি।

 

সাধারণ মানুষের অভিযোগ, বাজার তদারকি কার্যক্রম আরও জোরদার না হলে মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমানো কঠিন হবে।

 

গৃহিণীদের অনেকেই বলছেন, আগে সপ্তাহে একাধিকবার মাছ-মাংস কেনা হলেও এখন তা কমিয়ে দিতে হয়েছে। অনেক পরিবারে ডিম, ডাল ও সবজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। কেউ কেউ আবার বাজারের খরচ কমাতে একসঙ্গে বেশি পণ্য না কিনে প্রতিদিনের প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প অল্প করে বাজার করছেন।

 

আশুলিয়ার জামগড়া এলাকার এক ভ্যানচালক বলেন, সংসারে পাঁচজন মানুষ। সবার খাবার, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, বাড়িভাড়া ও চিকিৎসার খরচ আছে। কিন্তু আয় বাড়ছে না। বাজারে গেলেই মনে হয় টাকা যেন আগের চেয়ে দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।

 

অর্থনীতিবিদদের মতে, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ে। কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য ও মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যয় হয়। ফলে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে অন্যান্য খাতে ব্যয় কমাতে বাধ্য হন তারা।

 

সাভার ও আশুলিয়ার নিম্ন আয়ের মানুষের দাবি, বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকটের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় রেখে বাজার স্থিতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে শ্রমজীবী মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি না হলে মূল্যবৃদ্ধির এই চাপ দীর্ঘমেয়াদে তাদের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

 

নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতিতে সাভার-আশুলিয়ার বিশাল শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর জীবন এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। বাজারে স্বস্তি ফেরাতে কার্যকর নজরদারি ও দ্রুত পদক্ষেপের প্রত্যাশায় দিন গুনছেন সাধারণ মানুষ।