ঢাকা ০৪:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাভারে ভেজাল গুড় উৎপাদনের অভিযোগ, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভোক্তারা

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদিত গুড়ের একটি বড় অংশ বাজারে আসছে সাভার ঘিরে থাকা এলাকা থেকে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে শীত মৌসুম এলেই সাভারের আশপাশে গড়ে ওঠা অসংখ্য অস্থায়ী কারখানায় ভেজাল গুড় উৎপাদনের তৎপরতা বেড়ে যায় বলে অভিযোগ করছেন ভোক্তা ও স্থানীয়রা। রাসায়নিক, রং ও চিনি মিশিয়ে তৈরি এসব গুড় দেশের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ হয়ে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।

সাভারের আমিনবাজার, হেমায়েতপুর, বিরুলিয়া, ধামসোনা ও আশুলিয়া সংলগ্ন কিছু এলাকায় গোপনে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় গুড় তৈরির কারখানা। বাইরে থেকে এগুলো সাধারণ আখ বা খেজুরের গুড়ের কারখানা মনে হলেও ভেতরে চলছে ভিন্ন চিত্র। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃত আখ বা খেজুরের রসের পরিমাণ খুবই কম ব্যবহার করা হয়, বরং চিনি, গ্লুকোজ, ফিটকিরি, কেমিক্যাল রং ও বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদান মিশিয়ে দ্রুত গুড় তৈরি করা হচ্ছে।

একজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, গভীর রাতে এসব কারখানায় গুড় প্রস্তুত করা হয়। সকালে তা বিভিন্ন ট্রাকে করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার বাজারে পাঠানো হয়। অনেক সময় প্যাকেট বা খোলা গুড় দেখে সাধারণ ক্রেতাদের বোঝার উপায় থাকে না এটি আসল না ভেজাল। ফলে অজান্তেই ভোক্তারা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেজাল গুড়ে ব্যবহৃত কেমিক্যাল মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। দীর্ঘদিন এসব গুড় খেলে লিভার, কিডনি ও পাকস্থলীতে মারাত্মক সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়া, পেটব্যথা ও অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়ে। অথচ প্রাকৃতিক ও নিরাপদ খাবার হিসেবে পরিচিত গুড়ই এখন ভেজালের কারণে ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, কম দামে বেশি লাভের আশায় অসাধু চক্র এই ভেজাল গুড় উৎপাদনে জড়িত। আসল গুড় উৎপাদনে সময় ও খরচ বেশি হওয়ায় তারা সহজ পথে ভেজালের দিকে ঝুঁকছে। এতে একদিকে যেমন ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে প্রকৃত গুড় উৎপাদনকারীরাও বাজারে ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, প্রশাসনের নজরদারি দুর্বল হওয়ায় সাভারকেন্দ্রিক এই ভেজাল গুড় উৎপাদন দিন দিন বাড়ছে। মাঝে মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে কিছু কারখানাকে জরিমানা বা সিলগালা করলেও তা স্থায়ী সমাধান আনতে পারছে না। অভিযানের পর আবারও গোপনে কার্যক্রম শুরু হয়।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, ভেজাল খাদ্য উৎপাদনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে জনবল ও তথ্যের সীমাবদ্ধতার কারণে সব জায়গায় একসঙ্গে নজরদারি করা সম্ভব হচ্ছে না। তারা বলেন, নির্ভরযোগ্য তথ্য পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সচেতন মহল মনে করেন, ভেজাল গুড় উৎপাদন বন্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও নিয়মিত মনিটরিং জরুরি। একই সঙ্গে ভোক্তাদের সচেতন হতে হবে এবং সন্দেহজনক গুড় কেনা থেকে বিরত থাকতে হবে। উৎপাদনস্থল চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে এই ভেজাল চক্র অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

সব মিলিয়ে বলা যায়, সাভারকে ঘিরে ভেজাল গুড় উৎপাদনের অভিযোগ শুধু একটি এলাকার সমস্যা নয়, এটি জাতীয় পর্যায়ের জনস্বাস্থ্য সংকট। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভোক্তাদের আস্থা যেমন নষ্ট হবে, তেমনি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বড় ধরনের ব্যর্থতা হিসেবেই চিহ্নিত হবে এই অবস্থা।

ট্যাগ:

সাভারে ভেজাল গুড় উৎপাদনের অভিযোগ, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভোক্তারা

আপডেট সময়: ১০:৩৯:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদিত গুড়ের একটি বড় অংশ বাজারে আসছে সাভার ঘিরে থাকা এলাকা থেকে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে শীত মৌসুম এলেই সাভারের আশপাশে গড়ে ওঠা অসংখ্য অস্থায়ী কারখানায় ভেজাল গুড় উৎপাদনের তৎপরতা বেড়ে যায় বলে অভিযোগ করছেন ভোক্তা ও স্থানীয়রা। রাসায়নিক, রং ও চিনি মিশিয়ে তৈরি এসব গুড় দেশের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ হয়ে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।

সাভারের আমিনবাজার, হেমায়েতপুর, বিরুলিয়া, ধামসোনা ও আশুলিয়া সংলগ্ন কিছু এলাকায় গোপনে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় গুড় তৈরির কারখানা। বাইরে থেকে এগুলো সাধারণ আখ বা খেজুরের গুড়ের কারখানা মনে হলেও ভেতরে চলছে ভিন্ন চিত্র। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃত আখ বা খেজুরের রসের পরিমাণ খুবই কম ব্যবহার করা হয়, বরং চিনি, গ্লুকোজ, ফিটকিরি, কেমিক্যাল রং ও বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদান মিশিয়ে দ্রুত গুড় তৈরি করা হচ্ছে।

একজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, গভীর রাতে এসব কারখানায় গুড় প্রস্তুত করা হয়। সকালে তা বিভিন্ন ট্রাকে করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার বাজারে পাঠানো হয়। অনেক সময় প্যাকেট বা খোলা গুড় দেখে সাধারণ ক্রেতাদের বোঝার উপায় থাকে না এটি আসল না ভেজাল। ফলে অজান্তেই ভোক্তারা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেজাল গুড়ে ব্যবহৃত কেমিক্যাল মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। দীর্ঘদিন এসব গুড় খেলে লিভার, কিডনি ও পাকস্থলীতে মারাত্মক সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়া, পেটব্যথা ও অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়ে। অথচ প্রাকৃতিক ও নিরাপদ খাবার হিসেবে পরিচিত গুড়ই এখন ভেজালের কারণে ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, কম দামে বেশি লাভের আশায় অসাধু চক্র এই ভেজাল গুড় উৎপাদনে জড়িত। আসল গুড় উৎপাদনে সময় ও খরচ বেশি হওয়ায় তারা সহজ পথে ভেজালের দিকে ঝুঁকছে। এতে একদিকে যেমন ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে প্রকৃত গুড় উৎপাদনকারীরাও বাজারে ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, প্রশাসনের নজরদারি দুর্বল হওয়ায় সাভারকেন্দ্রিক এই ভেজাল গুড় উৎপাদন দিন দিন বাড়ছে। মাঝে মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে কিছু কারখানাকে জরিমানা বা সিলগালা করলেও তা স্থায়ী সমাধান আনতে পারছে না। অভিযানের পর আবারও গোপনে কার্যক্রম শুরু হয়।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, ভেজাল খাদ্য উৎপাদনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে জনবল ও তথ্যের সীমাবদ্ধতার কারণে সব জায়গায় একসঙ্গে নজরদারি করা সম্ভব হচ্ছে না। তারা বলেন, নির্ভরযোগ্য তথ্য পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সচেতন মহল মনে করেন, ভেজাল গুড় উৎপাদন বন্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও নিয়মিত মনিটরিং জরুরি। একই সঙ্গে ভোক্তাদের সচেতন হতে হবে এবং সন্দেহজনক গুড় কেনা থেকে বিরত থাকতে হবে। উৎপাদনস্থল চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে এই ভেজাল চক্র অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

সব মিলিয়ে বলা যায়, সাভারকে ঘিরে ভেজাল গুড় উৎপাদনের অভিযোগ শুধু একটি এলাকার সমস্যা নয়, এটি জাতীয় পর্যায়ের জনস্বাস্থ্য সংকট। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভোক্তাদের আস্থা যেমন নষ্ট হবে, তেমনি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বড় ধরনের ব্যর্থতা হিসেবেই চিহ্নিত হবে এই অবস্থা।