ঢাকা ০৬:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাভার ও আশুলিয়ার মহাসড়কের দুই পাশে বাড়ছে ময়লার ভাগাড়, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যে হুমকি

সাভার ও আশুলিয়া অঞ্চলের ব্যস্ত মহাসড়কগুলোর দুই পাশে দিন দিন বেড়েই চলেছে ময়লার ভাগাড়। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কসহ আশেপাশের সড়কগুলোতে চোখে পড়ছে আবর্জনার স্তূপ, যা শুধু পরিবেশের জন্যই নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণের ব্যবস্থা না থাকায় এবং সচেতনতার অভাবে এ সমস্যা ক্রমেই প্রকট আকার ধারণ করছে। এছাড়াও এ ব্যাপারে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।
প্রতিদিনই এসব এলাকায় গৃহস্থালি বর্জ্য, শিল্পকারখানার বর্জ্য, প্লাস্টিক ও পচনশীল নানা ধরনের আবর্জনা সড়কের পাশে ফেলে রাখা হচ্ছে। বিশেষ করে রাতের অন্ধকারে অনেকেই ট্রাক বা ভ্যানযোগে ময়লা এনে নির্জন স্থানে ফেলে যায়। ফলে সকালে পথচারী ও যানবাহন চলাচলকারীরা দুর্গন্ধ ও নোংরা পরিবেশের মুখোমুখি হচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. কামাল হোসেন বলেন, “আমরা প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, নাক চেপে ধরে চলতে হয়। বৃষ্টির দিনে অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়, কারণ ময়লা পানির সঙ্গে মিশে সড়কে ছড়িয়ে পড়ে।”
একই ধরনের অভিযোগ করেন গার্মেন্টস কর্মী রোজিনা আক্তার। তিনি বলেন, “কাজে যাওয়ার সময় রাস্তার পাশে এত ময়লা দেখি যে মনে হয় যেন ডাম্পিং স্টেশন। এতে আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর খারাপ প্রভাব পড়ছে।”
পরিবেশবিদরা বলছেন, এভাবে উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য ফেলে রাখার ফলে বাতাস, পানি ও মাটির দূষণ মারাত্মকভাবে বাড়ছে। পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী ড. মাহমুদুল হাসান বলেন, “এই ময়লার ভাগাড় থেকে ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হয়, যা শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি ও বিভিন্ন রোগের কারণ হতে পারে। এছাড়া প্লাস্টিক ও শিল্প বর্জ্য মাটির উর্বরতা নষ্ট করে এবং জলাশয়ে মিশে জলজ প্রাণীর জন্য হুমকি তৈরি করে।”
তিনি আরও বলেন, “সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই বর্জ্যের মধ্যে অনেক সময় মেডিকেল ও রাসায়নিক বর্জ্যও থাকে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এগুলো সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, “আমাদের দোকানের সামনে ময়লার স্তূপ হওয়ায় ক্রেতারা আসতে চায় না। এতে ব্যবসায় ক্ষতি হচ্ছে। আমরা একাধিকবার স্থানীয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেছি, কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান পাইনি।”
সড়কের পাশে বসবাসকারী আরেক বাসিন্দা হালিমা বেগম বলেন, “ময়লার কারণে এখানে মশা-মাছির উপদ্রব বেড়েছে। শিশুদের নানা রোগ হচ্ছে। রাতে দুর্গন্ধে ঘুমানো যায় না।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ সমস্যার পেছনে কয়েকটি মূল কারণ রয়েছে। প্রথমত, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব। দ্বিতীয়ত, জনসচেতনতার ঘাটতি। তৃতীয়ত, নিয়মিত মনিটরিং ও আইন প্রয়োগের দুর্বলতা।
পরিবহন চালক রফিকুল ইসলাম বলেন, “রাস্তায় ময়লা থাকার কারণে অনেক সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে পচা বর্জ্য বা পলিথিন সড়কে ছড়িয়ে পড়লে গাড়ির চাকা পিছলে যেতে পারে।”
এ বিষয়ে স্থানীয় পরিবেশ সংগঠনের এক সদস্য জানান, “আমরা কয়েকবার পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করেছি। কিন্তু মানুষ সচেতন না হলে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব থেকে এগিয়ে আসতে হবে।”
পরিবেশবিদদের মতে, সমস্যার সমাধানে দ্রুত কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। যেমন—নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, নির্দিষ্ট ডাম্পিং স্টেশন নির্ধারণ, অবৈধভাবে ময়লা ফেলা বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, এবং সর্বোপরি জনসচেতনতা বৃদ্ধি।
ড. মাহমুদুল হাসান বলেন, “সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবাই যদি নিজ নিজ বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলেন এবং অন্যদেরও সচেতন করেন, তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।”
এছাড়া আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি ব্যবহার, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য আলাদা করা এবং কমিউনিটি ভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
সবশেষে বলা যায়, সাভার ও আশুলিয়ার মহাসড়কের পাশে বাড়তে থাকা ময়লার ভাগাড় শুধু একটি স্থানীয় সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় পরিবেশগত সংকটের অংশ। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এর ভয়াবহতা আরও বাড়বে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সাধারণ জনগণকেও সচেতন হয়ে এগিয়ে আসতে হবে—পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তুলতে।
গুরুত্বপূর্ণ এই জনদুর্ভোগ নিয়ে জানতে চাইলে সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, মহাসড়কের দুই পাশে বিভিন্ন স্থানে ময়লা আবর্জনার বিষয়টি আমরা দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে একটি স্থায়ী ময়লা ডাম্পিংয়ের জন্য জমি খোঁজা হচ্ছে। জমি পাওয়া মাত্রই স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশনের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা হবে।
ট্যাগ:

সাভার ও আশুলিয়ার মহাসড়কের দুই পাশে বাড়ছে ময়লার ভাগাড়, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যে হুমকি

আপডেট সময়: ০৫:৫৬:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬
সাভার ও আশুলিয়া অঞ্চলের ব্যস্ত মহাসড়কগুলোর দুই পাশে দিন দিন বেড়েই চলেছে ময়লার ভাগাড়। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কসহ আশেপাশের সড়কগুলোতে চোখে পড়ছে আবর্জনার স্তূপ, যা শুধু পরিবেশের জন্যই নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণের ব্যবস্থা না থাকায় এবং সচেতনতার অভাবে এ সমস্যা ক্রমেই প্রকট আকার ধারণ করছে। এছাড়াও এ ব্যাপারে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।
প্রতিদিনই এসব এলাকায় গৃহস্থালি বর্জ্য, শিল্পকারখানার বর্জ্য, প্লাস্টিক ও পচনশীল নানা ধরনের আবর্জনা সড়কের পাশে ফেলে রাখা হচ্ছে। বিশেষ করে রাতের অন্ধকারে অনেকেই ট্রাক বা ভ্যানযোগে ময়লা এনে নির্জন স্থানে ফেলে যায়। ফলে সকালে পথচারী ও যানবাহন চলাচলকারীরা দুর্গন্ধ ও নোংরা পরিবেশের মুখোমুখি হচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. কামাল হোসেন বলেন, “আমরা প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, নাক চেপে ধরে চলতে হয়। বৃষ্টির দিনে অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়, কারণ ময়লা পানির সঙ্গে মিশে সড়কে ছড়িয়ে পড়ে।”
একই ধরনের অভিযোগ করেন গার্মেন্টস কর্মী রোজিনা আক্তার। তিনি বলেন, “কাজে যাওয়ার সময় রাস্তার পাশে এত ময়লা দেখি যে মনে হয় যেন ডাম্পিং স্টেশন। এতে আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর খারাপ প্রভাব পড়ছে।”
পরিবেশবিদরা বলছেন, এভাবে উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য ফেলে রাখার ফলে বাতাস, পানি ও মাটির দূষণ মারাত্মকভাবে বাড়ছে। পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী ড. মাহমুদুল হাসান বলেন, “এই ময়লার ভাগাড় থেকে ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হয়, যা শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি ও বিভিন্ন রোগের কারণ হতে পারে। এছাড়া প্লাস্টিক ও শিল্প বর্জ্য মাটির উর্বরতা নষ্ট করে এবং জলাশয়ে মিশে জলজ প্রাণীর জন্য হুমকি তৈরি করে।”
তিনি আরও বলেন, “সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই বর্জ্যের মধ্যে অনেক সময় মেডিকেল ও রাসায়নিক বর্জ্যও থাকে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এগুলো সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, “আমাদের দোকানের সামনে ময়লার স্তূপ হওয়ায় ক্রেতারা আসতে চায় না। এতে ব্যবসায় ক্ষতি হচ্ছে। আমরা একাধিকবার স্থানীয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেছি, কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান পাইনি।”
সড়কের পাশে বসবাসকারী আরেক বাসিন্দা হালিমা বেগম বলেন, “ময়লার কারণে এখানে মশা-মাছির উপদ্রব বেড়েছে। শিশুদের নানা রোগ হচ্ছে। রাতে দুর্গন্ধে ঘুমানো যায় না।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ সমস্যার পেছনে কয়েকটি মূল কারণ রয়েছে। প্রথমত, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব। দ্বিতীয়ত, জনসচেতনতার ঘাটতি। তৃতীয়ত, নিয়মিত মনিটরিং ও আইন প্রয়োগের দুর্বলতা।
পরিবহন চালক রফিকুল ইসলাম বলেন, “রাস্তায় ময়লা থাকার কারণে অনেক সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে পচা বর্জ্য বা পলিথিন সড়কে ছড়িয়ে পড়লে গাড়ির চাকা পিছলে যেতে পারে।”
এ বিষয়ে স্থানীয় পরিবেশ সংগঠনের এক সদস্য জানান, “আমরা কয়েকবার পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করেছি। কিন্তু মানুষ সচেতন না হলে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব থেকে এগিয়ে আসতে হবে।”
পরিবেশবিদদের মতে, সমস্যার সমাধানে দ্রুত কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। যেমন—নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, নির্দিষ্ট ডাম্পিং স্টেশন নির্ধারণ, অবৈধভাবে ময়লা ফেলা বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, এবং সর্বোপরি জনসচেতনতা বৃদ্ধি।
ড. মাহমুদুল হাসান বলেন, “সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবাই যদি নিজ নিজ বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলেন এবং অন্যদেরও সচেতন করেন, তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।”
এছাড়া আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি ব্যবহার, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য আলাদা করা এবং কমিউনিটি ভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
সবশেষে বলা যায়, সাভার ও আশুলিয়ার মহাসড়কের পাশে বাড়তে থাকা ময়লার ভাগাড় শুধু একটি স্থানীয় সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় পরিবেশগত সংকটের অংশ। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এর ভয়াবহতা আরও বাড়বে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সাধারণ জনগণকেও সচেতন হয়ে এগিয়ে আসতে হবে—পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তুলতে।
গুরুত্বপূর্ণ এই জনদুর্ভোগ নিয়ে জানতে চাইলে সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, মহাসড়কের দুই পাশে বিভিন্ন স্থানে ময়লা আবর্জনার বিষয়টি আমরা দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে একটি স্থায়ী ময়লা ডাম্পিংয়ের জন্য জমি খোঁজা হচ্ছে। জমি পাওয়া মাত্রই স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশনের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা হবে।