
আশুলিয়া এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান তীব্র বিদ্যুৎ সংকট এখন চরম আকার ধারণ করেছে। দিনের বেশিরভাগ সময়ই লোডশেডিং, আকস্মিক বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং অনিয়মিত সরবরাহের কারণে এলাকাবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে এসএসসি পরীক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও গৃহিণীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় দিনে গড়ে ১০থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না।
কখনও কখনও পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়ছেন। গরম আবহাওয়া, পানির সংকট এবং ডিজিটাল সেবার ব্যাঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বর্তমানে চলমান এসএসসি পরীক্ষার সময় এমন বিদ্যুৎ সংকট পরীক্ষার্থীদের জন্য বড় ধরনের মানসিক চাপ তৈরি করেছে। শিমুলিয়ার ইকরা প্রি ক্যাডেট স্কুল এন্ড কলেজের এসএসসি পরীক্ষার্থী শবনম ইসলাম কনা বলেন, এই তীব্র গরমের মধ্যে ঘনঘন লোডশেডিং এর কারণে পড়াশোনার প্রস্তুতি মারাত্মক ভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং রাতে পড়তে না পারায় তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন।
আরেকজন এসএসসি পরীক্ষার্থী রুবেল হাওলাদার বলেন, “রাতে যখন পড়তে বসি, হঠাৎ করে বিদ্যুৎ চলে যায়। মোবাইলের আলো বা মোমবাতি দিয়ে পড়া যায় না। এভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া খুব কঠিন হয়ে গেছে।”
মাতৃছায়া স্কুলের প্রধান শিক্ষক নাসির উদ্দিন বলেন, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বাড়ছে এবং তাদের প্রস্তুতি ব্যাহত হলে পরীক্ষার ফলাফলেও প্রভাব পড়তে পারে।
আশুলিয়ার বিভিন্ন গার্মেন্টস, অফিস ও ছোট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত চাকরিজীবীরাও বিদ্যুৎ সংকটে চরম সমস্যায় পড়েছেন। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল সিস্টেমে কাজ করে, তারা কাজের গতি ধরে রাখতে পারছেন না।
একজন বেসরকারি চাকরিজীবী হুমায়ূন আহমেদ বলেন, “অফিসে কাজ করার সময় হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। ফলে কম্পিউটার বন্ধ হয়ে যায়, ডেটা লস হয় এবং কাজের চাপ বেড়ে যায়। অনেক সময় সময়মতো কাজ শেষ করা সম্ভব হয় না।”
গার্মেন্টস কর্মীরা জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় মেশিন বন্ধ হয়ে যায়, উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং সময়মতো কাজ শেষ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে শ্রমিকদের অতিরিক্ত চাপ নিতে হচ্ছে।
একজন শ্রমিক বলেন, “মেশিন বন্ধ হয়ে গেলে আবার চালু করতে সময় লাগে। এতে কাজের গতি কমে যায়, আর মালিকপক্ষও চাপ দেয়।”
বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন গৃহিণীরা। রান্নাবান্না, পানি তোলা, ফ্রিজ ব্যবহার এবং দৈনন্দিন গৃহস্থালির কাজ সবকিছুই ব্যাহত হচ্ছে।
শামসুন্নাহার নামের একজন গৃহিণী বলেন, “গরমে রান্না করা খুব কষ্টকর হয়ে গেছে। ফ্রিজের খাবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পানির পাম্পও কাজ করে না, তাই পানি তুলতে কষ্ট হয়।”
আরেকজন গৃহিণী শিউলি ইসলাম জানান, “বাচ্চাদের পড়াশোনাও ঠিকমতো হচ্ছে না। রাতে লাইট না থাকলে তারা ঘুমাতে পারে না বা পড়তে পারে না।”
গৃহিণীরা অভিযোগ করছেন, বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সূচি বা পূর্ব ঘোষণা না থাকায় তারা প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকছেন।
ব্যবসা ও স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাব
আশুলিয়ার ছোট ব্যবসায়ীরা বিদ্যুৎ সংকটের কারণে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। দোকানপাটে ক্রেতা কমে গেছে, এবং অনেক দোকান নির্ভরশীল ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম চালাতে পারছে না।
দোকানদার জসিম উদ্দিন বলেন, সরকার নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়ার জন্য অফিসের সময় কমিয়ে এনেছে এবং সেই সাথে শপিং মলসহ দোকানপাট সন্ধ্যা সাতটার পর বন্ধ করে দিয়েছে তারপরও রাতভর এত লোডশেডিং কিসের ?
মুদি দোকানদার ইমরান হোসেন বলেন এত ঘন ঘন লোডশেডিং আমার জীবনে কখনো দেখি নাই। “ফ্রিজ না চললে ঠান্ডা পানীয় ও খাবার নষ্ট হয়ে যায়। এতে আমাদের লোকসান হয়।”
ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত হওয়ায় অনলাইন ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক উদ্যোক্তা বলছেন, সময়মতো অর্ডার প্রক্রিয়াকরণ করতে না পারায় গ্রাহক হারাচ্ছেন।
আশুলিয়ার সাধারণ মানুষ বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা দ্রুত সমাধান এবং স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
গাজীর চটের স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “প্রতিদিন এই ভোগান্তি আর সহ্য করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ না থাকলে জীবনের সব কাজ থেমে যায়।”
অন্য একজন বলেন, “আমরা নিয়মিত বিল দেই, কিন্তু সঠিক সেবা পাই না। এটা খুবই হতাশাজনক।”
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ কম থাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এছাড়াও লাইনের রক্ষণাবেক্ষণ ও ত্রুটির কারণে মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটছে।
একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, “আমরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছি। কিছু কারিগরি সমস্যা এবং অতিরিক্ত চাহিদার কারণে সাময়িক অসুবিধা হচ্ছে।”
স্থানীয় জনগণ দ্রুত এবং কার্যকর সমাধানের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, স্থায়ীভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না করা হলে শিক্ষা, অর্থনীতি ও জনজীবন আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা, বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং বিকল্প শক্তির ব্যবহার বাড়ানো হলে এই সমস্যা অনেকাংশে সমাধান সম্ভব।
আশুলিয়ার বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট শুধু একটি অবকাঠামোগত সমস্যা নয়, এটি এখন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে এসএসসি পরীক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও গৃহিণীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এই পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
এখন এলাকাবাসীর একটাই প্রত্যাশা নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনা।
রাউফুর রহমান পরাগ : 










