ঢাকা ০৬:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইউনিয়ন পরিষদে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য, ভূমিকায় ছাত্রদল সভাপতি

ঢাকার সাভারের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) ট্রেড লাইসেন্স, জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন, নাগরিকত্ব সনদ এবং ওয়ারিশ সনদসহ বিভিন্ন সেবা নিতে এসে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সেবাপ্রার্থীরা।

 

সরেজমিন অনুসন্ধানে পরিষদের প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থানীয় ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মীর সক্রিয় উপস্থিতি ও সম্পৃক্ততার চিত্র উঠে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে সেবাপ্রার্থীদের কাগজপত্র যাচাই, বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া, দ্রুত কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস এবং অর্থ দাবি করার অভিযোগও করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, ইউনিয়ন পরিষদে সচিব, গ্রাম পুলিশ ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্বে থাকার পরও রাজনৈতিক পরিচয়ধারী কয়েকজন ব্যক্তি পরিষদের ভেতরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এতে সরকারি সেবা কার্যক্রমের স্বাভাবিক পরিবেশ ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

 

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুরে সরেজমিন অনুসন্ধানে ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটক দিয়ে প্রবেশের পর কয়েকজন যুবক সেবাপ্রার্থীদের কাগজপত্র দেখে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলছেন। সচিবের কক্ষের সামনেও তাদের সক্রিয় উপস্থিতি দেখা যায়। সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ, কাগজপত্রের বিষয়ে পরামর্শ এবং পরিষদের বিভিন্ন কার্যক্রমে তাদের সম্পৃক্ততা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

 

এ সময় নিজেকে ছাত্রদলকর্মী পরিচয় দিয়ে জনি নামের এক যুবক বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি মো. শামীম আহমেদকে পরিষদের কার্যক্রম দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছেন। তার দাবি, তারা শামীম আহমেদের পক্ষ থেকে সেবাপ্রার্থীদের সহযোগিতা করছেন।তবে একাধিক সেবাপ্রার্থীর অভিযোগ, ওই যুবকেরা দ্রুত কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা দাবি করছেন। তাদের মাধ্যমে কাজ না করলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় বলেও অভিযোগ করেন কেউ কেউ। ট্রেড লাইসেন্সের নির্ধারিত ফি কমিয়ে দেওয়ার কথা বলেও সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

 

শাপলা হাউজিং এলাকার বাসিন্দা শাহিদা বেগম অভিযোগ করেন, ভোটার নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নপত্র নিতে এসে কয়েকজন যুবক তার কাছে ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে না পারায় তার কাজ হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।

মেইটকা গ্রামের বাসিন্দা লিয়াকত আলী বলেন, বাবার মৃত্যুর পর ওয়ারিশ সনদ নিতে গিয়ে নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ চাওয়ার অভিযোগের মুখে পড়েন তিনি। পরে বিষয়টি ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের জানালে তারাও অর্থ দিলে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার কথা বলেন বলে দাবি করেন তিনি।

 

সরেজমিন অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি মো. শামীম আহমেদ নিজেই ইউপি সচিব মোহাম্মদ নোমান খানের দাপ্তরিক কার্যক্রমের আশপাশে সক্রিয়ভাবে অবস্থান করছেন। সচিবের পক্ষে বিভিন্ন বিষয়ে সমন্বয় করা, সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলা এবং দাপ্তরিক কার্যক্রমে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে তাকে এমন ভূমিকায় দেখা যায়, যা অনেকটা সচিবের ব্যক্তিগত সহকারীর মতো। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর দায়িত্বের বাইরে রাজনৈতিক দলের একজন নেতার এ ধরনের সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

 

বিশেষ করে ইউপি সচিব মোহাম্মদ নোমান খানের দাপ্তরিক কার্যক্রমে শামীম আহমেদের এমন সক্রিয় ভূমিকা কেন এবং কোন দায়িত্ব বা অনুমোদনের ভিত্তিতে তিনি এসব কার্যক্রমে যুক্ত-তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

 

এ বিষয়ে ইউপি সচিব মোহাম্মদ নোমান খানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।সেবাপ্রার্থীদের ভোগান্তি কাম্য নয় জানিয়ে তিনি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার কথা জানান।

 

অভিযোগের বিষয়ে তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি মো. শামীম আহমেদের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি কারও কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে পরিষদে তার নেতৃত্বাধীন নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ও বিভিন্ন কার্যক্রমে সম্পৃক্ততার বিষয়ে ওঠা অভিযোগের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

 

এদিকে ইউনিয়ন পরিষদের মতো সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের এমন উপস্থিতি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাদের প্রশ্ন, নাগরিক সেবা নিতে এসে সাধারণ মানুষকে কেন রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিদের দ্বারস্থ হতে হবে?

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল আলম বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের সরকারি কার্যক্রমে অনিয়ম, বহিরাগতদের হস্তক্ষেপ বা সেবাপ্রার্থীদের হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

স্থানীয়দের দাবি, তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদের সেবা কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাব ও কথিত দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমে সরাসরি নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা হোক। একই সঙ্গে অর্থ দাবি ও সেবা বাণিজ্যের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

ট্যাগ:

ইউনিয়ন পরিষদে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য, ভূমিকায় ছাত্রদল সভাপতি

আপডেট সময়: ০৫:৩৪:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬

ঢাকার সাভারের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) ট্রেড লাইসেন্স, জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন, নাগরিকত্ব সনদ এবং ওয়ারিশ সনদসহ বিভিন্ন সেবা নিতে এসে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সেবাপ্রার্থীরা।

 

সরেজমিন অনুসন্ধানে পরিষদের প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থানীয় ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মীর সক্রিয় উপস্থিতি ও সম্পৃক্ততার চিত্র উঠে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে সেবাপ্রার্থীদের কাগজপত্র যাচাই, বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া, দ্রুত কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস এবং অর্থ দাবি করার অভিযোগও করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, ইউনিয়ন পরিষদে সচিব, গ্রাম পুলিশ ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্বে থাকার পরও রাজনৈতিক পরিচয়ধারী কয়েকজন ব্যক্তি পরিষদের ভেতরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এতে সরকারি সেবা কার্যক্রমের স্বাভাবিক পরিবেশ ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

 

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুরে সরেজমিন অনুসন্ধানে ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটক দিয়ে প্রবেশের পর কয়েকজন যুবক সেবাপ্রার্থীদের কাগজপত্র দেখে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলছেন। সচিবের কক্ষের সামনেও তাদের সক্রিয় উপস্থিতি দেখা যায়। সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ, কাগজপত্রের বিষয়ে পরামর্শ এবং পরিষদের বিভিন্ন কার্যক্রমে তাদের সম্পৃক্ততা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

 

এ সময় নিজেকে ছাত্রদলকর্মী পরিচয় দিয়ে জনি নামের এক যুবক বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি মো. শামীম আহমেদকে পরিষদের কার্যক্রম দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছেন। তার দাবি, তারা শামীম আহমেদের পক্ষ থেকে সেবাপ্রার্থীদের সহযোগিতা করছেন।তবে একাধিক সেবাপ্রার্থীর অভিযোগ, ওই যুবকেরা দ্রুত কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা দাবি করছেন। তাদের মাধ্যমে কাজ না করলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় বলেও অভিযোগ করেন কেউ কেউ। ট্রেড লাইসেন্সের নির্ধারিত ফি কমিয়ে দেওয়ার কথা বলেও সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

 

শাপলা হাউজিং এলাকার বাসিন্দা শাহিদা বেগম অভিযোগ করেন, ভোটার নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নপত্র নিতে এসে কয়েকজন যুবক তার কাছে ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে না পারায় তার কাজ হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।

মেইটকা গ্রামের বাসিন্দা লিয়াকত আলী বলেন, বাবার মৃত্যুর পর ওয়ারিশ সনদ নিতে গিয়ে নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ চাওয়ার অভিযোগের মুখে পড়েন তিনি। পরে বিষয়টি ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের জানালে তারাও অর্থ দিলে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার কথা বলেন বলে দাবি করেন তিনি।

 

সরেজমিন অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি মো. শামীম আহমেদ নিজেই ইউপি সচিব মোহাম্মদ নোমান খানের দাপ্তরিক কার্যক্রমের আশপাশে সক্রিয়ভাবে অবস্থান করছেন। সচিবের পক্ষে বিভিন্ন বিষয়ে সমন্বয় করা, সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলা এবং দাপ্তরিক কার্যক্রমে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে তাকে এমন ভূমিকায় দেখা যায়, যা অনেকটা সচিবের ব্যক্তিগত সহকারীর মতো। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর দায়িত্বের বাইরে রাজনৈতিক দলের একজন নেতার এ ধরনের সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

 

বিশেষ করে ইউপি সচিব মোহাম্মদ নোমান খানের দাপ্তরিক কার্যক্রমে শামীম আহমেদের এমন সক্রিয় ভূমিকা কেন এবং কোন দায়িত্ব বা অনুমোদনের ভিত্তিতে তিনি এসব কার্যক্রমে যুক্ত-তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

 

এ বিষয়ে ইউপি সচিব মোহাম্মদ নোমান খানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।সেবাপ্রার্থীদের ভোগান্তি কাম্য নয় জানিয়ে তিনি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার কথা জানান।

 

অভিযোগের বিষয়ে তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি মো. শামীম আহমেদের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি কারও কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে পরিষদে তার নেতৃত্বাধীন নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ও বিভিন্ন কার্যক্রমে সম্পৃক্ততার বিষয়ে ওঠা অভিযোগের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

 

এদিকে ইউনিয়ন পরিষদের মতো সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের এমন উপস্থিতি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাদের প্রশ্ন, নাগরিক সেবা নিতে এসে সাধারণ মানুষকে কেন রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিদের দ্বারস্থ হতে হবে?

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল আলম বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের সরকারি কার্যক্রমে অনিয়ম, বহিরাগতদের হস্তক্ষেপ বা সেবাপ্রার্থীদের হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

স্থানীয়দের দাবি, তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদের সেবা কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাব ও কথিত দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমে সরাসরি নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা হোক। একই সঙ্গে অর্থ দাবি ও সেবা বাণিজ্যের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।