ঢাকা ১২:০৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাভার ও আশুলিয়ায় অবৈধ ইটভাটার দৌরাত্ম্য: পরিবেশ দূষণ, জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার অনুসন্ধান

সাভার ও আশুলিয়া দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল হলেও এই এলাকার পরিবেশ আজ চরম হুমকির মুখে। শিল্পকারখানার চাপের পাশাপাশি অবৈধ ইটভাটার দৌরাত্ম্য পরিবেশ দূষণকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকারি অনুমোদন ও পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই পরিচালিত এসব ইটভাটা বাতাস, পানি ও মাটিকে বিষাক্ত করে তুলছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকায়।
সাভারের ধামসোনা, হেমায়েতপুর, আমিনবাজার সংলগ্ন এলাকা এবং আশুলিয়ার জিরাবো, জামগড়া, টঙ্গাবাড়ি, নয়ারহাট ও বাইপাইল এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ ইটভাটা। আইন অনুযায়ী আবাসিক এলাকা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কৃষিজমি ও জলাশয়ের নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এসব বিধিনিষেধ উপেক্ষা করেই বসতবাড়ি ও ফসলি জমির মাঝখানে দিনের পর দিন ইট পোড়ানো হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শীত মৌসুম এলেই ইটভাটার ধোঁয়ায় আকাশ ঢেকে যায়। কালো ধোঁয়া ও ছাই বাতাসে ভেসে আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। সকালবেলা ঘরবাড়ি, গাছপালা ও ফসলের ওপর ছাইয়ের স্তর জমে থাকতে দেখা যায়। অনেক এলাকায় দিনের বেলাতেও সূর্যের আলো স্পষ্টভাবে দেখা যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ইটভাটা থেকে নির্গত সালফার ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ও সূক্ষ্ম বস্তুকণা মানুষের ফুসফুসের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এসব বিষাক্ত উপাদানের কারণে শিশুদের নিউমোনিয়া, হাঁপানি ও শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বয়স্ক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে। আশুলিয়া ও সাভারের বিভিন্ন ক্লিনিক ও হাসপাতালে শ্বাসকষ্টজনিত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
কৃষকদের অভিযোগ, ইটভাটার কারণে তাদের ফসল মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। জমিতে জমে থাকা কালো ছাই মাটির উর্বরতা নষ্ট করছে। ধান, সবজি ও শাকজাতীয় ফসলে ফলন কমে যাচ্ছে বলে জানান অনেক কৃষক। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে কৃষিকাজ ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগজনক।
পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, ইটভাটা স্থাপনের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) এবং লাইসেন্স বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব জিগজ্যাগ বা আধুনিক প্রযুক্তির ভাটা ব্যবহারের নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সাভার ও আশুলিয়ার বেশিরভাগ ইটভাটাই পুরোনো ও অবৈধ প্রযুক্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। অনেক ভাটায় পোড়ানো হচ্ছে কাঠ, টায়ার ও বিভিন্ন বর্জ্য, যা পরিবেশ দূষণ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এসব অবৈধ ইটভাটা বছরের পর বছর ধরে চালু রয়েছে। মাঝে মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালানো হলেও তা বেশিরভাগ সময়ই সীমিত পরিসরে হয়। কয়েকটি ভাটা সাময়িকভাবে বন্ধ বা জরিমানা করা হলেও অভিযান শেষ হলেই আবার গোপনে কার্যক্রম শুরু হয়। এতে প্রশাসনের কার্যকারিতা ও সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, ইটভাটার কারণে শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মও মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। বাতাসের মান অবনতির ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও ত্বরান্বিত হচ্ছে। গাছপালা ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, যা এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করছে।
সচেতন মহলের মতে, অবৈধ ইটভাটা বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা জরুরি। নিয়মিত ও কঠোর অভিযান, ভাটার মালিকদের আইনের আওতায় আনা এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্প নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারে উৎসাহ দিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণকে সচেতন করে তুলতে হবে, যাতে তারা পরিবেশ রক্ষায় সোচ্চার ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সাভার ও আশুলিয়ায় অবৈধ ইটভাটা এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্য, কৃষি ও টেকসই উন্নয়নের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই অঞ্চলের পরিবেশ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে, যার দায় এড়াতে পারবে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ট্যাগ:

সাভার ও আশুলিয়ায় অবৈধ ইটভাটার দৌরাত্ম্য: পরিবেশ দূষণ, জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার অনুসন্ধান

আপডেট সময়: ০৯:১৩:৩০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬
সাভার ও আশুলিয়া দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল হলেও এই এলাকার পরিবেশ আজ চরম হুমকির মুখে। শিল্পকারখানার চাপের পাশাপাশি অবৈধ ইটভাটার দৌরাত্ম্য পরিবেশ দূষণকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকারি অনুমোদন ও পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই পরিচালিত এসব ইটভাটা বাতাস, পানি ও মাটিকে বিষাক্ত করে তুলছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকায়।
সাভারের ধামসোনা, হেমায়েতপুর, আমিনবাজার সংলগ্ন এলাকা এবং আশুলিয়ার জিরাবো, জামগড়া, টঙ্গাবাড়ি, নয়ারহাট ও বাইপাইল এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ ইটভাটা। আইন অনুযায়ী আবাসিক এলাকা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কৃষিজমি ও জলাশয়ের নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এসব বিধিনিষেধ উপেক্ষা করেই বসতবাড়ি ও ফসলি জমির মাঝখানে দিনের পর দিন ইট পোড়ানো হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শীত মৌসুম এলেই ইটভাটার ধোঁয়ায় আকাশ ঢেকে যায়। কালো ধোঁয়া ও ছাই বাতাসে ভেসে আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। সকালবেলা ঘরবাড়ি, গাছপালা ও ফসলের ওপর ছাইয়ের স্তর জমে থাকতে দেখা যায়। অনেক এলাকায় দিনের বেলাতেও সূর্যের আলো স্পষ্টভাবে দেখা যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ইটভাটা থেকে নির্গত সালফার ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ও সূক্ষ্ম বস্তুকণা মানুষের ফুসফুসের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এসব বিষাক্ত উপাদানের কারণে শিশুদের নিউমোনিয়া, হাঁপানি ও শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বয়স্ক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে। আশুলিয়া ও সাভারের বিভিন্ন ক্লিনিক ও হাসপাতালে শ্বাসকষ্টজনিত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
কৃষকদের অভিযোগ, ইটভাটার কারণে তাদের ফসল মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। জমিতে জমে থাকা কালো ছাই মাটির উর্বরতা নষ্ট করছে। ধান, সবজি ও শাকজাতীয় ফসলে ফলন কমে যাচ্ছে বলে জানান অনেক কৃষক। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে কৃষিকাজ ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগজনক।
পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, ইটভাটা স্থাপনের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) এবং লাইসেন্স বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব জিগজ্যাগ বা আধুনিক প্রযুক্তির ভাটা ব্যবহারের নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সাভার ও আশুলিয়ার বেশিরভাগ ইটভাটাই পুরোনো ও অবৈধ প্রযুক্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। অনেক ভাটায় পোড়ানো হচ্ছে কাঠ, টায়ার ও বিভিন্ন বর্জ্য, যা পরিবেশ দূষণ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এসব অবৈধ ইটভাটা বছরের পর বছর ধরে চালু রয়েছে। মাঝে মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালানো হলেও তা বেশিরভাগ সময়ই সীমিত পরিসরে হয়। কয়েকটি ভাটা সাময়িকভাবে বন্ধ বা জরিমানা করা হলেও অভিযান শেষ হলেই আবার গোপনে কার্যক্রম শুরু হয়। এতে প্রশাসনের কার্যকারিতা ও সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, ইটভাটার কারণে শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মও মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। বাতাসের মান অবনতির ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও ত্বরান্বিত হচ্ছে। গাছপালা ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, যা এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করছে।
সচেতন মহলের মতে, অবৈধ ইটভাটা বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা জরুরি। নিয়মিত ও কঠোর অভিযান, ভাটার মালিকদের আইনের আওতায় আনা এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্প নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারে উৎসাহ দিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণকে সচেতন করে তুলতে হবে, যাতে তারা পরিবেশ রক্ষায় সোচ্চার ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সাভার ও আশুলিয়ায় অবৈধ ইটভাটা এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্য, কৃষি ও টেকসই উন্নয়নের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই অঞ্চলের পরিবেশ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে, যার দায় এড়াতে পারবে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।