ঢাকা ০৪:২৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ধামরাই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিজেই আজ ‘রোগী’, চিকিৎসক ও ওষুধ সংকটে পাঁচ লাখ মানুষের চিকিৎসা সেবা হুমকির মুখে

  • আশরাফুল আলম
  • আপডেট সময়: ০৭:০৮:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
  • 61

ঢাকার সর্ববৃহৎ উপজেলা ধামরাইয়ের একমাত্র সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান—ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আজ নিজেই যেন এক গুরুতর রোগী হয়ে পড়েছে। জনসংখ্যার তুলনায় অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, তীব্র চিকিৎসক ও জনবল সংকট, জীবনরক্ষাকারী ওষুধের চরম স্বল্পতা এবং প্রায়শই লোডশেডিংয়ের কারণে স্থবির হয়ে পড়া ডায়াগনস্টিক সেবার কারণে এই হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে আসা পাঁচ লক্ষাধিক সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ এখন চরমে পৌঁছেছে।

মাত্র ৫০ শয্যার এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ রোগী বহির্বিভাগে সেবা নিতে ভিড় করেন। এর বিপরীতে অন্তর্বিভাগে নিয়মিতভাবেই প্রায় ১৫০ জন রোগী ভর্তি থাকেন, যা নির্ধারিত ধারণক্ষমতার তিন গুণেরও বেশি।

সাম্প্রতিক সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, সকাল থেকেই হাসপাতালের বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টারে উপচে পড়া ভিড় এবং দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। কিন্তু তীব্র গরমে টিকিট কাউন্টার সংলগ্ন এলাকায় পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা বা ফ্যান না থাকায় সেবাগ্রহীতারা চরম অস্বস্তির মধ্যে পড়েন। বিপুল সংখ্যক রোগীর বিপরীতে দায়িত্বরত চিকিৎসকদের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত থাকায় প্রতিটি রোগীকে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয় এবং চিকিৎসকদের পক্ষেও কাঙ্ক্ষিত মানসম্মত সময় ও সেবা দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।

​বহির্বিভাগ পেরিয়ে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন নিয়ে ওষুধ কাউন্টারে গেলে শুরু হয় নতুন ভোগান্তি। নিয়মানুযায়ী সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ও আগত রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করার কথা থাকলেও পর্যাপ্ত স্টকের অভাবে বেশিরভাগ প্রয়োজনীয় ওষুধই মিলছে না। অনেক রোগী প্রেসক্রিপশনে সাতটি ওষুধ লেখা থাকলেও মাত্র এক বা দুটি ওষুধ হাতে পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।

​এদিকে ৫০ শয্যার এই হাসপাতালের অন্তর্বিভাগের দৃশ্য আরও বেশি করুণ ও অমানবিক। নির্ধারিত বেডের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকায় বেড সংকটে অনেক রোগীকে বাধ্য হয়ে হাসপাতালের নোংরা মেঝেতেই বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এর ওপর যুক্ত হয়েছে তীব্র ও দীর্ঘমেয়াদী লোডশেডিংয়ের সমস্যা। বিদ্যুৎ চলে গেলেই গরমে ও তাপদাহে শিশুসহ সাধারণ রোগীরা বিছানায় ছটফট করতে থাকেন। এমনকি হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের চিকিৎসকদের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি না পাওয়ায় নার্সদের ওপরই ভরসা রাখতে হয়।

হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রমে আরও বড় একটি অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে প্যাথলজি ও এক্স-রে বিভাগের অচলাবস্থা। বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও জেনারেটরের অপর্যাপ্ততা কিংবা ত্রুটির কারণে নিয়মিত এক্স-রে এবং প্রয়োজনীয় ল্যাব টেস্টগুলো বন্ধ থাকছে। ফলে গরিব ও অসহায় রোগীরা সরকারি স্বল্পমূল্যের পরীক্ষার সুযোগ থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হচ্ছেন এবং বাধ্য হয়ে চড়া মূল্যে বাইরের বিভিন্ন প্রাইভেট ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা করাতে গিয়ে আর্থিকভাবে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, চিকিৎসকমহলে শূন্যপদ এবং জনবলের ঘাটতি এই সংকটের অন্যতম মূল কারণ। প্রতিষ্ঠানটিতে চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট ও ফিল্ড স্টাফ মিলে মোট ১৩৫টি পদের মধ্যে প্রায় ৩০টি পদ দীর্ঘকাল ধরে শূন্য রয়েছে। এর বাইরেও আরও ৯ জন চিকিৎসক তাদের নির্দিষ্ট পদে দায়িত্ব পালন না করে সংযুক্তিতে বা ডেপুটেশনে ঢাকায় কর্মরত আছেন। প্যাথলজি বিভাগেও প্রয়োজনীয় জনবল ও টেকনোলজিস্টের অভাবে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

​যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবার মান বৃদ্ধি পাওয়ায় রোগীর চাপ বহুগুণ বেড়েছে, তবে জনবলের এই তীব্র খরা কাটিয়ে ওঠা তাদের জন্য অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছে। ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আহমেদুল হক তিতাস জানান, তাদের বেশ কয়েকজন চিকিৎসক বর্তমানে ঢাকায় সংযুক্তিতে কর্মরত আছেন। সীমিত জনবল ও চিকিৎসক নিয়েই তাদের প্রতিদিন এই বিশাল সংখ্যক রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। জনবল সংকটের এই আশঙ্কাজনক বিষয়টি ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। সাধারণ মানুষের এই মানবিক সংকট নিরসনে দ্রুত শূন্য পদগুলোতে চিকিৎসক ও জনবল পদায়ন, সংযুক্তিতে থাকা চিকিৎসকদের নিজ কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও সেবাগ্রহীতারা।

ট্যাগ:

ধামরাই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিজেই আজ ‘রোগী’, চিকিৎসক ও ওষুধ সংকটে পাঁচ লাখ মানুষের চিকিৎসা সেবা হুমকির মুখে

আপডেট সময়: ০৭:০৮:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬

ঢাকার সর্ববৃহৎ উপজেলা ধামরাইয়ের একমাত্র সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান—ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আজ নিজেই যেন এক গুরুতর রোগী হয়ে পড়েছে। জনসংখ্যার তুলনায় অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, তীব্র চিকিৎসক ও জনবল সংকট, জীবনরক্ষাকারী ওষুধের চরম স্বল্পতা এবং প্রায়শই লোডশেডিংয়ের কারণে স্থবির হয়ে পড়া ডায়াগনস্টিক সেবার কারণে এই হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে আসা পাঁচ লক্ষাধিক সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ এখন চরমে পৌঁছেছে।

মাত্র ৫০ শয্যার এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ রোগী বহির্বিভাগে সেবা নিতে ভিড় করেন। এর বিপরীতে অন্তর্বিভাগে নিয়মিতভাবেই প্রায় ১৫০ জন রোগী ভর্তি থাকেন, যা নির্ধারিত ধারণক্ষমতার তিন গুণেরও বেশি।

সাম্প্রতিক সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, সকাল থেকেই হাসপাতালের বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টারে উপচে পড়া ভিড় এবং দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। কিন্তু তীব্র গরমে টিকিট কাউন্টার সংলগ্ন এলাকায় পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা বা ফ্যান না থাকায় সেবাগ্রহীতারা চরম অস্বস্তির মধ্যে পড়েন। বিপুল সংখ্যক রোগীর বিপরীতে দায়িত্বরত চিকিৎসকদের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত থাকায় প্রতিটি রোগীকে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয় এবং চিকিৎসকদের পক্ষেও কাঙ্ক্ষিত মানসম্মত সময় ও সেবা দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।

​বহির্বিভাগ পেরিয়ে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন নিয়ে ওষুধ কাউন্টারে গেলে শুরু হয় নতুন ভোগান্তি। নিয়মানুযায়ী সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ও আগত রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করার কথা থাকলেও পর্যাপ্ত স্টকের অভাবে বেশিরভাগ প্রয়োজনীয় ওষুধই মিলছে না। অনেক রোগী প্রেসক্রিপশনে সাতটি ওষুধ লেখা থাকলেও মাত্র এক বা দুটি ওষুধ হাতে পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।

​এদিকে ৫০ শয্যার এই হাসপাতালের অন্তর্বিভাগের দৃশ্য আরও বেশি করুণ ও অমানবিক। নির্ধারিত বেডের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকায় বেড সংকটে অনেক রোগীকে বাধ্য হয়ে হাসপাতালের নোংরা মেঝেতেই বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এর ওপর যুক্ত হয়েছে তীব্র ও দীর্ঘমেয়াদী লোডশেডিংয়ের সমস্যা। বিদ্যুৎ চলে গেলেই গরমে ও তাপদাহে শিশুসহ সাধারণ রোগীরা বিছানায় ছটফট করতে থাকেন। এমনকি হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের চিকিৎসকদের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি না পাওয়ায় নার্সদের ওপরই ভরসা রাখতে হয়।

হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রমে আরও বড় একটি অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে প্যাথলজি ও এক্স-রে বিভাগের অচলাবস্থা। বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও জেনারেটরের অপর্যাপ্ততা কিংবা ত্রুটির কারণে নিয়মিত এক্স-রে এবং প্রয়োজনীয় ল্যাব টেস্টগুলো বন্ধ থাকছে। ফলে গরিব ও অসহায় রোগীরা সরকারি স্বল্পমূল্যের পরীক্ষার সুযোগ থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হচ্ছেন এবং বাধ্য হয়ে চড়া মূল্যে বাইরের বিভিন্ন প্রাইভেট ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা করাতে গিয়ে আর্থিকভাবে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, চিকিৎসকমহলে শূন্যপদ এবং জনবলের ঘাটতি এই সংকটের অন্যতম মূল কারণ। প্রতিষ্ঠানটিতে চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট ও ফিল্ড স্টাফ মিলে মোট ১৩৫টি পদের মধ্যে প্রায় ৩০টি পদ দীর্ঘকাল ধরে শূন্য রয়েছে। এর বাইরেও আরও ৯ জন চিকিৎসক তাদের নির্দিষ্ট পদে দায়িত্ব পালন না করে সংযুক্তিতে বা ডেপুটেশনে ঢাকায় কর্মরত আছেন। প্যাথলজি বিভাগেও প্রয়োজনীয় জনবল ও টেকনোলজিস্টের অভাবে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

​যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবার মান বৃদ্ধি পাওয়ায় রোগীর চাপ বহুগুণ বেড়েছে, তবে জনবলের এই তীব্র খরা কাটিয়ে ওঠা তাদের জন্য অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছে। ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আহমেদুল হক তিতাস জানান, তাদের বেশ কয়েকজন চিকিৎসক বর্তমানে ঢাকায় সংযুক্তিতে কর্মরত আছেন। সীমিত জনবল ও চিকিৎসক নিয়েই তাদের প্রতিদিন এই বিশাল সংখ্যক রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। জনবল সংকটের এই আশঙ্কাজনক বিষয়টি ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। সাধারণ মানুষের এই মানবিক সংকট নিরসনে দ্রুত শূন্য পদগুলোতে চিকিৎসক ও জনবল পদায়ন, সংযুক্তিতে থাকা চিকিৎসকদের নিজ কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও সেবাগ্রহীতারা।