
ঢাকার অদূরে শিল্পাঞ্চল সাভার ও আশুলিয়ায় মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সাভারের বেদেপাড়া ও রাজাশন এলাকাসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকা, বস্তি, নদী-খালসংলগ্ন নির্জন স্থান, মহাসড়কের পাশের কিছু এলাকা এবং গলিপথে দীর্ঘদিন ধরে মাদক কেনাবেচা ও সেবনের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা। তাদের আশঙ্কা, মাদকের সহজলভ্যতা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এর প্রভাব পড়বে শিক্ষার্থী, পরিবার, সামাজিক পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সাভারের কিছু বস্তি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, নদী ও খালপাড়ের নির্জন স্থান, আমিনবাজার, হেমায়েতপুর, বিরুলিয়া, তেঁতুলঝোড়া এবং আশপাশের কিছু এলাকায় মাদক সেবন ও বিক্রির অভিযোগ মাঝেমধ্যে সামনে আসে। অন্যদিকে আশুলিয়ার জামগড়া, বাইপাইল, ধামসোনা, নরসিংহপুর, জিরাবো, নিশ্চিন্তপুরসহ বিভিন্ন এলাকায়ও মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান ও নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তবে এসব স্থানে বর্তমানে কোথায় কী মাত্রায় মাদক কেনাবেচা হচ্ছে, তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত ও অভিযানের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
অভিভাবকদের অভিযোগ, আগে যেখানে সন্তানদের সন্ধ্যার পর বাইরে যাওয়া নিয়ে তেমন চিন্তা করতে হতো না, এখন অনেক পরিবারেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে এবং কী করছে—এসব নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকছেন তারা। বিশেষ করে স্কুল-কলেজপড়ুয়া কিশোরদের মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা তাদের মধ্যে ভয় তৈরি করেছে।
সাভারের এক অভিভাবক বলেন, আমরা সন্তানদের ভালোভাবে পড়াশোনা করিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু আশপাশের পরিবেশ নিয়ে সব সময় চিন্তায় থাকতে হয়। মাদক যদি সহজে পাওয়া যায়, তাহলে কিশোরদের বিপথে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
আশুলিয়ার আরেক অভিভাবক আব্দুর রহমান বলেন, সন্তান কখন কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে, সেটা সব সময় নজরে রাখা সম্ভব নয়। মাদকের বিরুদ্ধে শুধু অভিযান চালালেই হবে না, বিক্রেতাদের পাশাপাশি যারা কিশোরদের মাদকের দিকে টেনে নিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, মাদক শুধু একজন ব্যক্তির জীবন নষ্ট করে না; এর প্রভাব পুরো পরিবার ও সমাজের ওপর পড়ে। মাদকাসক্তির কারণে পারিবারিক অশান্তি, অর্থনৈতিক সংকট, চুরি-ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে মনে করছেন তারা। ফলে মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অভিভাবকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী রেজাউল করিম বলেন, মাদকের কারণে এলাকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে—এমন অভিযোগ আমরা অনেক সময় শুনি। নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি থাকলে মাদক ব্যবসায়ীরা কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তবে অভিযান যেন শুধু সাময়িক না হয়, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষাবিদদের মতে, মাদক প্রতিরোধে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা, তাদের চলাফেরা ও বন্ধুদের সম্পর্কে খোঁজ রাখা এবং মাদকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করা দরকার। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয়দের দাবি, মাদক বিক্রির অভিযোগ পাওয়া এলাকাগুলোতে নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তরুণদের পুনর্বাসন ও চিকিৎসার সুযোগও বাড়াতে হবে।
সচেতন নাগরিকরা বলছেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসন—সব পক্ষকে একযোগে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাদকের ছোবল থেকে রক্ষা করতে এখনই কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
স্টাফ রিপোর্টার 










