ঢাকা ০৮:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাভার-আশুলিয়ায় পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের নামে তাণ্ডব, চরম ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ

ঢাকার শিল্পাঞ্চল সাভার ও আশুলিয়ায় পোশাক শ্রমিকদের টানা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়ছে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো। কোথাও যানবাহন চলাচল বন্ধ, কোথাও দীর্ঘ যানজট, আবার কোথাও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া আদায়ের আন্দোলনে কারণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পুরো এলাকার জনজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানে।

গত কয়েক দিন ধরে সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা সর্বনিম্ন মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের উত্তাপ বাড়তে থাকায় বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে উত্তেজনা। শ্রমিকদের একাংশ সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়ক এবং আশুলিয়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হচ্ছে যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের।

এদিকে শ্রমিকদের টানা আন্দোলনে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন সাভার ও আশুলিয়া সাধারণ মানুষ। প্রায় সব পেশার মানুষকেই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। এ সময় অনেক সাধারণ মানুষ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কিছুদিন পর পর পোশাক শ্রমিকদের উশৃংখল আচরণের কারণে সাভার ও আশুলিয়া সাধারণ মানুষের বসবাস করার অযোগ্য হয়ে উঠেছে।

এছাড়াও ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি অযৌক্তিক বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ। সম্পূর্ণ অযৌক্তিক দাবি গুলোর ব্যাপারে সরকারকে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করার দাবী জানান তারা।

আন্দোলনের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী ও দূরপাল্লার যাত্রীরা। অনেকেই নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারছেন না। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া মানুষও পড়ছেন বিপাকে। বিশেষ করে যানজটে আটকে থাকা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের দুর্ভোগ আরও বেশি।

স্থানীয় এক চাকরিজীবী হান্নান সরকার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে যেতে হয়। কিন্তু শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকতে হচ্ছে। কখন রাস্তা বন্ধ হবে, কখন যান চলাচল স্বাভাবিক হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। শ্রমিকদের দাবি থাকতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষকে এভাবে জিম্মি করে আন্দোলন করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

আশুলিয়ার জামগড়া এলাকার মুদি দোকানদার আফজাল হোসেন বলেন, পোশাক শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন মাধ্যমে আদায়ের চেষ্টা না করে প্রতিদিন সড়ক জুড়ে তাণ্ডব চালাচ্ছে। গতকাল উশৃংখল পোশাক শ্রমিকরা আমার মুদি দোকানে পর্যন্ত হামলা চালিয়ে লুটপাট করে।

আমিনুল ইসলাম নামে একজন অভিযোগ করে বলেন, আমি আমার মাকে নিয়ে হসপিটালে যাচ্ছিলাম হঠাৎ করে পোশাক শ্রমিকের একটি দল আমাদের গাড়ি ভাঙচুর শুরু করলো যা খুবই দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। এভাবে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে দাবি আদায় করা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

শ্যামলী পরিবহনের চালক আব্দুল হাই বলেন, পোশাক শ্রমিকরা তাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে যা খুশি তাই করছে, সাভার ও আশুলিয়ার মানুষ আজকে তাদের কাছে জিম্মি হয়ে গেছে। আমরা সড়কে গাড়ি চালাতে সব সময় আতঙ্কে থাকি।

সাভারের বাসিন্দা সুলতানা পারভীন বলেন, পোশাক শ্রমিকদের অযৌক্তিক আন্দোলন আমাদের একটা অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে। বাসা থেকে বের হতে ভয় লাগে। কয়েক দিন ধরে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে পারছি না। এতে বাচ্চাদের পড়াশোনার মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।

এদিকে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে যানবাহন ভাঙচুরের অভিযোগ এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সড়কে চলাচলকারী বাস, ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহনের চালকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অনেক পরিবহন চালক ক্ষতির আশঙ্কায় গাড়ি নিয়ে সড়কে নামতে চাইছেন না। এতে গণপরিবহনের সংকট আরও বেড়ে যাচ্ছে। যাঁরা জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন রাস্তায় বের হন, তাঁরাও পড়েছেন অনিশ্চয়তার মধ্যে।

এক পরিবহন চালক ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, আমরা দিন আনি দিন খাই। গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বের হলে যাত্রী পরিবহন করে সংসার চালাতে হয়। কিন্তু আন্দোলনের সময় গাড়ি ভাঙচুর কিংবা আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটলে আমাদের সর্বস্ব হারানোর আশঙ্কা থাকে। শ্রমিকদের সমস্যা থাকলে মালিকপক্ষ ও প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান করা উচিত। সাধারণ মানুষের সম্পদ নষ্ট করে কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে না।

অন্যদিকে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও আন্দোলনের কারণে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বিভিন্ন দোকানপাট, মার্কেট ও ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ক্রেতাদের উপস্থিতি কমে গেছে। কোথাও নিরাপত্তার কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হচ্ছে। দিনমজুর, রিকশাচালক, ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দৈনন্দিন আয় কমে যাওয়ায় তাঁদের পরিবারেও দেখা দিয়েছে আর্থিক সংকট।

এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হাসান বলেন, আন্দোলন হলেই আমাদের দোকান বন্ধ রাখতে হয়। মানুষ ভয়ে রাস্তায় বের হয় না, ক্রেতাও আসে না। প্রতিদিন দোকান বন্ধ থাকলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি থাকলে তা অবশ্যই সমাধান হওয়া উচিত। তবে সাধারণ মানুষের জীবিকা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে।

সচেতন মহলের মতে, পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই শিল্পের শ্রমিকদের বেতন ভাতা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা মালিকপক্ষের দায়িত্ব। একই সঙ্গে আন্দোলনের নামে যানবাহন ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, সড়ক অবরোধ এবং জনসাধারণের চলাচলে বাধা সৃষ্টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শ্রমিকদের দাবি এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা দুটিই সমান গুরুত্ব পাওয়া জরুরি।

এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের মতে, শ্রমিক প্রতিনিধি, কারখানা মালিকপক্ষ, শিল্প পুলিশ ও প্রশাসনের সমন্বয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে। পাশাপাশি সহিংসতা ও নাশকতার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

সাভার ও আশুলিয়ার বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, সরকার দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সাভার ও আশুলিয়ার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে কঠোর ভূমিকা পালন করবে। কারণ শ্রমিক, মালিক ও সাধারণ মানুষ সবাইকে নিয়েই এই শিল্পাঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবন। আন্দোলনের কারণে যেন কোনো নিরীহ মানুষ, শ্রমিক কিংবা সাধারণ যাত্রীকে আর দুর্ভোগের শিকার হতে না হয়, সেটিই এখন স্থানীয়দের প্রধান দাবি।

আজ সকালে স্থানীয় সংসদ সদস্য ডাক্তার দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সাংবাদিকদের বলেন, সাভার ও আশুলিয়ায় শ্রমিক আন্দোলনের নামে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সরকারের নেতাকর্মীরা সমস্ত সাভার ও আশুলিয়া এলাকা জুড়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে মাঠে নেমেছে। এসময় তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী ও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের নেতাকর্মীদের প্রতিহত করার আহ্বান জানান।

এ বিষয়ে শিল্পপুলিশ -১ এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম বলেন, সাভার ও আশুলিয়ায় কয়েকশত ছোট বড় পোশাক কারখানা আছে। কিন্তু কিছুদিন পর পর বিভিন্ন পোশাক কারখানায় বিভিন্ন দাবি নিয়ে শ্রমিকরা অহেতুক আন্দোলনের নামে সড়ক-মহাসড়ক দখল করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের ফলে পুরো সাভার ও আশুলিয়ায় নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এতে সাধারণ মানুষের জীবনে ভোগান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে আমরা চিন্তিত। কোন অবস্থাতেই আমরা আর এই উশৃঙ্খর আচরণ মেনে নিব না। আমরা পুলিশের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের শান্ত থেকে তাদের দাবি আদায়ে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান করার অনুরোধ জানিয়েছি।

ট্যাগ:

সাভার-আশুলিয়ায় পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের নামে তাণ্ডব, চরম ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ

আপডেট সময়: ০৮:৫৫:১৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

ঢাকার শিল্পাঞ্চল সাভার ও আশুলিয়ায় পোশাক শ্রমিকদের টানা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়ছে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো। কোথাও যানবাহন চলাচল বন্ধ, কোথাও দীর্ঘ যানজট, আবার কোথাও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া আদায়ের আন্দোলনে কারণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পুরো এলাকার জনজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানে।

গত কয়েক দিন ধরে সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা সর্বনিম্ন মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের উত্তাপ বাড়তে থাকায় বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে উত্তেজনা। শ্রমিকদের একাংশ সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়ক এবং আশুলিয়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হচ্ছে যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের।

এদিকে শ্রমিকদের টানা আন্দোলনে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন সাভার ও আশুলিয়া সাধারণ মানুষ। প্রায় সব পেশার মানুষকেই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। এ সময় অনেক সাধারণ মানুষ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কিছুদিন পর পর পোশাক শ্রমিকদের উশৃংখল আচরণের কারণে সাভার ও আশুলিয়া সাধারণ মানুষের বসবাস করার অযোগ্য হয়ে উঠেছে।

এছাড়াও ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি অযৌক্তিক বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ। সম্পূর্ণ অযৌক্তিক দাবি গুলোর ব্যাপারে সরকারকে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করার দাবী জানান তারা।

আন্দোলনের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী ও দূরপাল্লার যাত্রীরা। অনেকেই নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারছেন না। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া মানুষও পড়ছেন বিপাকে। বিশেষ করে যানজটে আটকে থাকা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের দুর্ভোগ আরও বেশি।

স্থানীয় এক চাকরিজীবী হান্নান সরকার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে যেতে হয়। কিন্তু শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকতে হচ্ছে। কখন রাস্তা বন্ধ হবে, কখন যান চলাচল স্বাভাবিক হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। শ্রমিকদের দাবি থাকতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষকে এভাবে জিম্মি করে আন্দোলন করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

আশুলিয়ার জামগড়া এলাকার মুদি দোকানদার আফজাল হোসেন বলেন, পোশাক শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন মাধ্যমে আদায়ের চেষ্টা না করে প্রতিদিন সড়ক জুড়ে তাণ্ডব চালাচ্ছে। গতকাল উশৃংখল পোশাক শ্রমিকরা আমার মুদি দোকানে পর্যন্ত হামলা চালিয়ে লুটপাট করে।

আমিনুল ইসলাম নামে একজন অভিযোগ করে বলেন, আমি আমার মাকে নিয়ে হসপিটালে যাচ্ছিলাম হঠাৎ করে পোশাক শ্রমিকের একটি দল আমাদের গাড়ি ভাঙচুর শুরু করলো যা খুবই দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। এভাবে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে দাবি আদায় করা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

শ্যামলী পরিবহনের চালক আব্দুল হাই বলেন, পোশাক শ্রমিকরা তাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে যা খুশি তাই করছে, সাভার ও আশুলিয়ার মানুষ আজকে তাদের কাছে জিম্মি হয়ে গেছে। আমরা সড়কে গাড়ি চালাতে সব সময় আতঙ্কে থাকি।

সাভারের বাসিন্দা সুলতানা পারভীন বলেন, পোশাক শ্রমিকদের অযৌক্তিক আন্দোলন আমাদের একটা অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে। বাসা থেকে বের হতে ভয় লাগে। কয়েক দিন ধরে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে পারছি না। এতে বাচ্চাদের পড়াশোনার মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।

এদিকে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে যানবাহন ভাঙচুরের অভিযোগ এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সড়কে চলাচলকারী বাস, ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহনের চালকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অনেক পরিবহন চালক ক্ষতির আশঙ্কায় গাড়ি নিয়ে সড়কে নামতে চাইছেন না। এতে গণপরিবহনের সংকট আরও বেড়ে যাচ্ছে। যাঁরা জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন রাস্তায় বের হন, তাঁরাও পড়েছেন অনিশ্চয়তার মধ্যে।

এক পরিবহন চালক ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, আমরা দিন আনি দিন খাই। গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বের হলে যাত্রী পরিবহন করে সংসার চালাতে হয়। কিন্তু আন্দোলনের সময় গাড়ি ভাঙচুর কিংবা আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটলে আমাদের সর্বস্ব হারানোর আশঙ্কা থাকে। শ্রমিকদের সমস্যা থাকলে মালিকপক্ষ ও প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান করা উচিত। সাধারণ মানুষের সম্পদ নষ্ট করে কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে না।

অন্যদিকে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও আন্দোলনের কারণে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বিভিন্ন দোকানপাট, মার্কেট ও ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ক্রেতাদের উপস্থিতি কমে গেছে। কোথাও নিরাপত্তার কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হচ্ছে। দিনমজুর, রিকশাচালক, ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দৈনন্দিন আয় কমে যাওয়ায় তাঁদের পরিবারেও দেখা দিয়েছে আর্থিক সংকট।

এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হাসান বলেন, আন্দোলন হলেই আমাদের দোকান বন্ধ রাখতে হয়। মানুষ ভয়ে রাস্তায় বের হয় না, ক্রেতাও আসে না। প্রতিদিন দোকান বন্ধ থাকলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি থাকলে তা অবশ্যই সমাধান হওয়া উচিত। তবে সাধারণ মানুষের জীবিকা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে।

সচেতন মহলের মতে, পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই শিল্পের শ্রমিকদের বেতন ভাতা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা মালিকপক্ষের দায়িত্ব। একই সঙ্গে আন্দোলনের নামে যানবাহন ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, সড়ক অবরোধ এবং জনসাধারণের চলাচলে বাধা সৃষ্টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শ্রমিকদের দাবি এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা দুটিই সমান গুরুত্ব পাওয়া জরুরি।

এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের মতে, শ্রমিক প্রতিনিধি, কারখানা মালিকপক্ষ, শিল্প পুলিশ ও প্রশাসনের সমন্বয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে। পাশাপাশি সহিংসতা ও নাশকতার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

সাভার ও আশুলিয়ার বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, সরকার দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সাভার ও আশুলিয়ার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে কঠোর ভূমিকা পালন করবে। কারণ শ্রমিক, মালিক ও সাধারণ মানুষ সবাইকে নিয়েই এই শিল্পাঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবন। আন্দোলনের কারণে যেন কোনো নিরীহ মানুষ, শ্রমিক কিংবা সাধারণ যাত্রীকে আর দুর্ভোগের শিকার হতে না হয়, সেটিই এখন স্থানীয়দের প্রধান দাবি।

আজ সকালে স্থানীয় সংসদ সদস্য ডাক্তার দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সাংবাদিকদের বলেন, সাভার ও আশুলিয়ায় শ্রমিক আন্দোলনের নামে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সরকারের নেতাকর্মীরা সমস্ত সাভার ও আশুলিয়া এলাকা জুড়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে মাঠে নেমেছে। এসময় তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী ও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের নেতাকর্মীদের প্রতিহত করার আহ্বান জানান।

এ বিষয়ে শিল্পপুলিশ -১ এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম বলেন, সাভার ও আশুলিয়ায় কয়েকশত ছোট বড় পোশাক কারখানা আছে। কিন্তু কিছুদিন পর পর বিভিন্ন পোশাক কারখানায় বিভিন্ন দাবি নিয়ে শ্রমিকরা অহেতুক আন্দোলনের নামে সড়ক-মহাসড়ক দখল করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের ফলে পুরো সাভার ও আশুলিয়ায় নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এতে সাধারণ মানুষের জীবনে ভোগান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে আমরা চিন্তিত। কোন অবস্থাতেই আমরা আর এই উশৃঙ্খর আচরণ মেনে নিব না। আমরা পুলিশের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের শান্ত থেকে তাদের দাবি আদায়ে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান করার অনুরোধ জানিয়েছি।