
ঢাকার ধামরাইয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে ২৩২টি পূজামণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভাজুড়ে মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে প্রতিমার রং, সাজসজ্জা ও পূজার আনুষঙ্গিক কাজ। প্রতিমা তৈরির মূল কাজ শেষ করে এখন দেবী দুর্গা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের প্রতিমায় রঙের শেষ আঁচড় দিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। অন্যদিকে, উৎসবকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি মন্দিরে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং স্বেচ্ছাসেবক দল রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখা, শব্দের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় পূজামণ্ডপগুলোতে ঘুরে দেখা যায়, কোথাও প্রতিমার গায়ে রং করা হচ্ছে, কোথাও চলছে চোখ আঁকা ও অলংকরণের কাজ। আবার কোনো কোনো মণ্ডপে প্রতিমার সাজসজ্জার পাশাপাশি প্যান্ডেল প্রস্তুত ও আলোকসজ্জার কাজ চলছে। পূজার দিন যত ঘনিয়ে আসছে, কারিগর ও আয়োজকদের ব্যস্ততাও তত বাড়ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব কাজ শেষ করতে দিন-রাত পরিশ্রম করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ধামরাইয়ের গাংগুটিয়া ইউনিয়নের বারবাড়িয়ায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ঠাকুরবাড়ির পূজামণ্ডপেও চলছে প্রতিমা সাজানোর কাজ। সেখানে প্রতিমায় রং করার কাজে ব্যস্ত কারিগররা। তাঁদের কেউ প্রতিমার শরীরে রং করছেন, কেউ অলংকরণের কাজ করছেন, আবার কেউ দেবী ও অন্য প্রতিমাগুলোর সাজসজ্জা চূড়ান্ত করতে ব্যস্ত।
ওই মণ্ডপে কর্মরত প্রতিমাশিল্পী স্বপন পাল জানান, চার দিন আগেই প্রতিমা তৈরির মাটির কাজ শেষ হয়েছে। এরপর থেকে শুরু হয়েছে রং করার কাজ। প্রতিমার সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে ধাপে ধাপে বিভিন্ন রং ব্যবহার করতে হয়। প্রতিটি অংশে নিখুঁতভাবে কাজ করতে হয় বলে সময় ও শ্রম দুটিই বেশি লাগে।
তিনি বলেন, প্রতিমা তৈরির কাজের প্রতিটি ধাপই গুরুত্বপূর্ণ। মাটির কাজ শেষ হওয়ার পর রং ও সাজসজ্জার মাধ্যমে প্রতিমার চূড়ান্ত রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়। তাই কাজ শেষ করার জন্য তাড়াহুড়া করলেও গুণগত মানের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হয়।
উপকরণের দাম বাড়লেও বাড়েনি মজুরি,দুর্গোৎসবের প্রস্তুতির ব্যস্ততার মধ্যেও প্রতিমাশিল্পীদের মধ্যে রয়েছে বাড়তি ব্যয়ের চাপ নিয়ে উদ্বেগ। তাঁদের ভাষ্য, প্রতিমা তৈরির বিভিন্ন উপকরণ ও রঙের দাম বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় তাঁদের পারিশ্রমিক বাড়েনি। ফলে উপকরণ সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করা পর্যন্ত নানা ধরনের আর্থিক চাপ সামলাতে হচ্ছে।
ধামরাই পৌরসভার একটি পূজামণ্ডপে কর্মরত প্রতিমাশিল্পী শ্যামল পাল বলেন, রঙের দাম অনেক বেড়েছে। কিন্তু তাঁদের মজুরি সেই অনুপাতে বাড়েনি। এতে আগের তুলনায় কাজের ব্যয় বেড়েছে। তারপরও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা সাজানোর কাজ শেষ করতে হচ্ছে।
প্রতিমাশিল্পীরা জানান, প্রতিমা তৈরির সঙ্গে মাটির কাজ, খড়, বাঁশ, কাঠ, রং ও সাজসজ্জার বিভিন্ন উপকরণ জড়িত। প্রতিমার আকার ও নকশার ওপর নির্ভর করে কাজের পরিমাণও কমবেশি হয়। প্রতিটি প্রতিমা তৈরিতে দীর্ঘ সময় ধরে শ্রম দিতে হয়। বিশেষ করে পূজার আগে শেষ পর্যায়ের কাজগুলোতে বাড়তি মনোযোগ প্রয়োজন হয়।তাঁদের মতে, প্রতিমা তৈরির কাজ কেবল জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও ঐতিহ্য। তাই নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁরা নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
নিরাপত্তায় সিসিটিভি ও স্বেচ্ছাসেবক দল, দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন আয়োজকেরা। এ জন্য প্রতিটি মন্দিরে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং নিরাপত্তার কাজে সহযোগিতার জন্য স্বেচ্ছাসেবক দল রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ধামরাই উপজেলা মন্দির কমিটির সদস্য সচিব রঞ্জিত পাল জানান, পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি মন্দিরে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হবে। পাশাপাশি প্রতিটি মণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবক দল রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উৎসব চলাকালে দর্শনার্থীদের চলাচল, শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে দ্রুত সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবকেরা ভূমিকা রাখবেন।
তিনি বলেন, পূজার আয়োজন নির্বিঘ্ন রাখতে মণ্ডপ কমিটিগুলোকে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো ধরনের অবহেলা না করে সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতা নিয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পূজা উদ্যাপনের প্রস্তুতি চলছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, স্বেচ্ছাসেবকদের দায়িত্ব পালন এবং প্রশাসনের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা গেলে মণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আয়োজকদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ।
ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখতে প্রশাসনের নির্দেশনা দুর্গাপূজার আয়োজন ঘিরে ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং আশপাশের বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় যেন বিঘ্ন না ঘটে, সে বিষয়েও সতর্ক রয়েছে উপজেলা প্রশাসন। বিশেষ করে নামাজ ও আজানের সময় সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংযত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল মামুন জানান, পূজার আয়োজনের সময় নামাজ ও আজানের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবহার সীমিত রাখতে আয়োজকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া নির্দেশনা অনুসরণ করে পূজামণ্ডপ পরিচালনা করতে আয়োজকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে উৎসবের পরিবেশ বজায় রাখতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি এলাকার মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক সম্প্রীতি প্রকাশেরও একটি উপলক্ষ। এ সময় বিভিন্ন ধর্ম ও শ্রেণি-পেশার মানুষ পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। ফলে উৎসবের আনন্দ বজায় রাখার পাশাপাশি সবার স্বাভাবিক চলাচল ও দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত আয়োজকেরা পূজার সময় ঘনিয়ে আসায় প্রতিমা তৈরির কাজের পাশাপাশি মণ্ডপ সাজানো, আলোকসজ্জা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছেন আয়োজকেরা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব কাজ শেষ করতে মণ্ডপ কমিটির সদস্যরা নিজেদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে নিচ্ছেন।
প্রতিমাশিল্পীরা রং ও সাজসজ্জার কাজ শেষ করার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, মণ্ডপ কমিটির সদস্যরা নিরাপত্তা ব্যবস্থা, দর্শনার্থীদের চলাচল এবং উৎসব পরিচালনার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও স্বেচ্ছাসেবক দল গঠনের উদ্যোগও এসব প্রস্তুতির অংশ।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, প্রতিমা ও মণ্ডপ সাজানোর কাজ যথাসময়ে শেষ হবে। পাশাপাশি নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গোৎসব উদ্যাপন করা সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে ধামরাইয়ের ২৩২টি পূজামণ্ডপে এখন উৎসবের প্রস্তুতি ঘিরে ব্যস্ততা। প্রতিমাশিল্পীদের নিপুণ হাতে দেবী দুর্গার রূপ ফুটিয়ে তোলার কাজ যেমন এগিয়ে চলছে, তেমনি নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রস্তুতিও চলছে সমানতালে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা করছেন, আয়োজক, প্রশাসন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্মিলিত সহযোগিতায় ধামরাইয়ে শারদীয় দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হবে।